৮ বছর পর হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে যেভাবে ফিরে পেলেন মা

যার চলে যায় সেই বুঝে হায়, বিচ্ছেদে কি যন্ত্রনা! গানটির এই লাইনটি হারিয়ে যাওয়া ছেলের মায়ের যন্ত্রনার একটি বহিঃপ্রকাশ বলা যেতে পারে। সেই হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে যদি আবার ফিরে পাওয়া যায় তাহলে মায়ের অবস্থা কেমন হবে একবার ভাবুন।

ঘটনা আজ থেকে ৮ বছর আগের। মাইদুল ইসলাম সুজন (১০)কে নিয়ে তার মা বিলকিস বেগম ঢাকার তুরাগ এলাকায় তার বোন মোর্শেদা বেগমের বাসায় থাকতেন। ২০১২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরে সুজনকে ফ্লেক্সিলোড করতে বাইরে পাঠায় তার মা। এর পর আর সে বাসায় ফিরে আসেনি। অনেক খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার তুরাগ থানায় জিডি করেন তার মা বিলকিস বেগম।

এর পরের গল্প কাকতালীয় বলা চলে। হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে দীর্ঘ আট বছর পর পটুয়াখালীতে খুঁজে পেলেন এক মা। শুক্রবার রাতে পটুয়াখালী সদর থানায় অনুষ্ঠানিকভাবে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে মাইদুল ইসলাম সুজন (১৮) নামের সেই ছেলেটিকে তার মা বিলকিস বেগমের কাছে ফিরিয়ে দেন জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মাহফুজুর রহমান। এ সময় অন্যান্যদের উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মুকিত হাসান, সদর থানার অফিসার ইনচার্জ আখতার মোর্শেদ।

ইসলামী আন্দোলনের পটুয়াখালী জেলা সাধারণ সম্পাদক (সেক্রেটারী) আর.আই.এম অহিদুজ্জামান জানান, ব্যক্তিগত কাজ করাতে তিনি প্রায়ই পটুয়াখালী শহরের কলাতলা এলাকায় প্রিয়জন কম্পিউটার দোকানে যেতেন। ওই দোকানের কর্মচরী মাইদুল ইসলাম সুজনকে প্রায়ই মন খারাপ করে থাকতে দেখে একদিন ছেলেটির পরিচয় জানতে চান। পরে ছেলেটি তাকে জানায়, ছোট বেলায় সে হারিয়ে যায়। ছেলেটি আরো জানায় একদিন তার মা তাকে ফ্লেক্সিলোড করতে ঘরের বাইরে পাঠায়, এর পর সে বাসায় না ফিরে সদর ঘাট এসে পটুয়াখালীর লঞ্চে ওঠে । ওই সময় রাতে প্রচণ্ড শীতে কাঁপতে দেখে পাশে থাকা মকবুল আহমেদ মাস্টার তাকে শীতের কাপড় দেয়। পরে তার বাসায় নিয়ে সুজনকে আসেন এবং তার কম্পিউটার দোকানের কর্মচারী হিসেবে রাখেন। এই আট বছর সেখানেই কাজ করছে সে।

তিনি বলেন, সুজন আমাকে তার বাবার নাম মতিউর রহমান মুন্সী, মায়ের নাম বিলকিস বেগম, বাড়ি বরগুনার আমতলীর টেপুরা গ্রামে জানায়। তিনি আরও বলেন, পরে সুজনের তথ্য অনুযায়ী বিষয়টি আমি আমতলীর হলদিয়া ইউনিয়নের টেপুরার সাবেক ইউপি মেম্বার মোহাম্মদ আবু সালেহকে জানাই এবং তিনি খোঁজ-খবর নিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত হন সুজন ওই এলাকার হারিয়ে যাওয়া সেই ছেলেটি।

অহিদুজ্জামান জানান, বিষয়টি আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য মাইদুল ইসলাম সুজনকে নিয়ে ২ জুলাই সকালে তার গ্রামের বাড়ি আমতলীর হলদিয়া ইউনিয়নের টেপুরায় যান এবং সেখানে মা বিলকিস বেগমসহ পরিবারের লোকজন মাইদুল ইসলাম সুজনকে শনাক্ত করেন। এ সময় সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

তিনি বলেন, বিষয়টি পরে পটুয়াখালীর পুলিশ সুপারকে জানালে তিনি ছেলেটিকে নিয়ে সদর থানায় যেতে বলেন এবং শুক্রবার রাতে সদর থানা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাইদুল ইসলাম সুজনকে তার মা’র কাছে তুলে দেয়া হয়।

দীর্ঘ ৮ বছর পর ছেলে মাইদুল ইসলাম সুজনকে ফিরে পেয়ে মা বিলকিস বেগম আনন্দে অশ্রুসিক্ত কন্ঠে বলেন, আমার স্বামী নেই। ছেলেকে হারিয়ে এই আটটি বছর আমি মরার মত বেঁচে ছিলাম।। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে কোটি কোটি শুকরিয়া। আল্লাহর অশেষ রহমতে আট বছর পরেও আমার হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে ফিরে পেয়েছি।

মাইদুল ইসলাম সুজনের মামা জসিম উদ্দিন মুন্সী বলেন, হারিয়ে যাওয়া ভাগ্নেকে আর কোন দিন ফিরে পাবো তা ভাবতেও পারিনি। আল্লাহর কৃপায় আট বছর পর ভাগ্নেকে ফিরে পেয়েছি। আজ আমাদের পরিবারের মাঝে কত আনন্দ লাগছে তা বুঝাতে পারবো না।

বরগুনার আমতলীর হলুদিয়া ইউপির সাবেক মেম্বার ও দক্ষিণ কাঠালিয়া তাজেম আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ আবু সালেহ্ বলেন, আর.আই.এম অহিদুজ্জামানের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে তাৎক্ষণিকভাবে আমি খোঁজ-খবর নিয়ে নিশ্চিত হই এই মাইদুল ইসলাম সুজনই আমাদের গ্রামের হারিয়ে যাওয়া ছেলেটি। পরে তার মাসহ পরিবারের অন্যান্য লোকজনকে ঘটনাটি জানাই। সুজনকে ফিরে পেয়ে আমরা আনন্দিত।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

এই বিভাগের আরো খবর
মন্তব্য
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: