হোটেল থেকে এইচডিবি ব্লকে স্থানান্তর সিঙ্গাপুর প্রবাসীদের।

এপ্রিলের ৬ তারিখ থেকে পাঁচ তাঁরকা হোটেলে ঘরবন্দী হয়ে ছিলাম। হোটেলের পরিবেশটা অনেক সুন্দর। পার্ক ও সুইমিংপুল থাকার কারণে হোটেলের সৌন্দর্য আরো বেশি সুন্দর ছিল। হোটেলের জানালা খোলার ব্যবস্থা না থাকায় বাহিরের আলোবাতাস গায়ে লাগতো না। বি’পদ সামনে এসে দাঁড়ালে, যতো সুন্দর জিনিস সামনে থাকুক না কেন তখন উপভোগ করার মানসিকতা মাথায় আসে না।

নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা হয়ে যায় চ্যালে’ঞ্জ। বিছানা আর ঘরের চার দেওয়াল এইটুকু ছিল আমা’র প্রতিদিনের সঙ্গী। বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে পিট হয়ে গেছে শক্ত কাঠের মত। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার মত ভয়াবহ পরিস্তিতির মধ্যে দিনরাত পার হতো। মাঝেমাঝে মনে হতো এখন বুঝি আমা’র মৃ’ত্যু হবে।

মনের মধ্যে সবসময় অ’স্থিরতা কাজ করতো। খাওয়াদাওয়ার প্রতিও তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। সবসময় আত’ঙ্কের মধ্যে ছিলাম। সারারাত দুচোখে ঘুম আসতো না। ভোরবেলা ঘুমের ভাব আসলে ঘুমিয়ে পড়তাম।

বিভিন্ন জায়গা থেকে করো’নায় আক্রা’ন্তের খবর আসতো। আমা’র খুব কাছের বন্ধুদের করো’নায় আক্রা’ন্ত হওয়ার খবরে মনটা আরো বেশি খারা’প হয়ে যেতো। রাতদিন কিভাবে যে পার করতাম সেই কথা ভাবলে শরীর বারবার শিইরে ওঠে।

হোটেল থেকে আমাদের সরিয়ে নেওয়া হল এইচডিবি ব্ল’কে। করোনায় বন্দী জীবনের এটা দ্বিতীয় ধাপ। আবার সেই একইভাবে ব্যাগ টানাটানি। ২১ তলা হাউজের ১৭ তলায় আমা’র রুম। ঘরের দরজা, জানালা এখন খুলে রাখা যায়। হোটেলে থাকাকালীন হোটেলের দরজা খোলা নিষে’ধ ছিল।

আর পাচঁ তাঁরকা হোটেলের জানালা তো খোলাই যায় না। এর মত চরম কষ্টের জীবন আর হতেই পারে না। মাঝেমাঝে জানালার পাশে গিয়ে আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে একবুক হতাশা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। তখন সময়কে মনে হতো অনেক দীর্ঘ। ভেবেছিলাম এইচডিবি ব্ল’কে রাখা মানে সীমিত সময়ের জন্য বাহিরের মুক্ত পরিবেশে হাঁটতে পারবো।

খোলা আকাশের নিচেয় দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার আনন্দে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারবো। পাখির কিচিরমিচির শব্দ শুনতে পারবো। ফুলের সুবাস নাকে মাখতে পারবো। কিন্তু তা আর হল না। চারিদিকে পু’লিশ থাকে কড়া পাহারায়। সীমানা পার হওয়ার কোনো দুঃসা’হস নেই। কাছের বন্ধুরা সবাই দূরে।

এই শহরের স্থানীয় মানুষগুলোর স্বাধীনভাবে হাঁটাচলা দেখলে নিজেকে অ’পরাধী মনে হয়। মনে হয় তারাই বুঝি মানুষ আর আমরা চিড়িয়াখানার বন্দী প্রাণী। জীবনে হয়তো অনেক বড় কোনো অ’পরাধ করে ফেলেছি। সেই অ’পরাধের প্রায়শ্চিত্ত করা প্রধান কাজ। প্রবাস নামের এই কল’ঙ্ক কোনোদিন মুছে যাবার নয়। কিছু কিছু সময় কল’ঙ্ক হওয়া গর্বের। আমি সেই প্রবাস নামের কল’ঙ্কে গর্বিত।

প্রতিদিন জীবনের সাথে ম’রণের খেলা আবার ম’রণের কাছে পাওয়া নতুন জীবন। অফিস থেকে বাসা আর বাসা থেকে অফিস! মাঝখানের সময়টা পেটের ক্ষুধা নিবারণ করার জন্য নিজের সাথে নিজে যু’দ্ধ যু’দ্ধ খেলা।

তারপর প্রতিদিন অফিসে নুতন নুতন নিয়মকানুন। সেইসব নিয়ম অ’বাধ্য হওয়ার উপায় নাই। নাক আমা’র দড়ি অন্যের হাতে। শুয়ে থাকতে থাকতে পিঠ আর পিঠের মত নাই, দেয়ালে ঠেকবে আর কি! নিজের গল্প নিজে বলি আর নিজে শুনি।

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে পাই ক্যান্টিনের রাঁন্না করা খাবার। কোনোদিন সবজি সিদ্ধ হয় কোনোদিন হয় না। পেটের ক্ষু’ধার কাছে সব খাবারই মনে হয় বেহেস্তী খানা। জিব্হা আর দাঁতের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ ভালো সম্পর্কের কারণে পাকস্থলী পায় শান্তি! আহা কি পরম শান্তি! মধ্যরাতে ঘুম ভে’ঙ্গে গেলে খোলা

জানালা দিয়ে বাহিরের দিকে তাকিয়ে থাকি। রাত ঘুমিয়ে যায়। রাতের বুকে শহর ঘুমিয়ে যায়। পরবাসির দু’টি চোখে ঘুম আর আসে না।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

এই বিভাগের আরো খবর
মন্তব্য
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: