হেফাজতকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে: ১৪ দল

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনকে হেফাজতে ইসলাম চ্যালেঞ্জ করেছে বলে অভিযোগ তুলেছে ১৪ দলীয় জোটের নেতারা। এই আন্দোলনকে গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত আখ্যায়িত করে তারা বলেছেন, হেফাজতের বিষয়ে যতই কৌশল অবলম্বন করি, সনদ দেই, আর যেভাবে যতই খুশি করার চেষ্টা করি, তারা তাদের রাজনৈতিক দর্শন থেকে সরবে না। দমন করতে না পারলে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সমস্ত শক্তি নিয়ে নামতে হবে। যথাযথভাবে আইন প্রয়োগ করে এদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

সোমবার (২৯ মার্চ) স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন ১৪ দলের সমন্বয়ক ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু।
ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় ১৪ দলের শরিকরা সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তোলেন। কেউ কেউ অভিযোগ তোলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ১৪ দলের সাক্ষাতে সব দলের প্রতিনিধিত্ব না থাকা নিয়ে। জোটের কোনও কোনও শরিক দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সমালোচনা করেন।

সভাপতির বক্তব্যে আমির হোসেন আমু বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু সাড়ে তিন বছরের মধ্যে পুনর্গঠন ও পুনর্নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আগামী দিনে দেশ কীভাবে চলবে, সেই নির্দেশনাও তিনি দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অনুসরণ করলে আমাদের সামনে যে বিষয়গুলো আসছে, তা আসার কথা নয়। ভবিষ্যতেও আসতে পারবে না।’

মোদিবিরোধী আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা আমু বলেন, ‘মোদির স্লোগানটি তারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছে। এর আড়ালে তারা অপ্রকাশ্যভাবে দিবসগুলো প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে।’

তিনি বলেন, ‘দেশের উন্নয়নের সামনে বিকল্প কিছু না পেয়ে ধর্মান্ধের স্লোগান ছাড়া তাদের সামনে কিছু ছিল না। তবে এটা বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা মনে করি না। তারা সুযোগ পেলেই সাম্প্রদায়িকতার আশ্রয় গ্রহণ করে। এই সাম্প্রদায়িকতার স্লোগান পাকিস্তান থেকেই চলে আসছে। বারবার সাম্প্রদায়িকতার ওপর আশ্রয় নিয়ে দেশের ওপর আঘাত করতে চায়। হেফাজতই হোক বা তাদের আড়ালে জামায়াত-শিবির পাকিস্তানি শক্তি হোক, তারা কোনও বিচ্ছিন্ন শক্তি নয়। তারা একাত্তরের পরাজিত শক্তি। তারা ৭৫ ঘটিয়েছে। শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করেছে।’

সরকারকে উদ্দেশ করে আমু বলেন, ‘এগুলোকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। কঠিনভাবে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। সরকারের আইন কঠিনভাবে তাদের ওপর প্রয়োগ করতে হবে। ১৪ দলের সভা থেকে আমরা এই সুপারিশ করছি।’

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া এবং তাঁর ভাস্কর্য ভাঙার পর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন এখানে এসেছে। এগুলোর বিষয়ে কর্ণপাত দিতে সরকারকে অনুরোধ করছি। এদের ছাড় দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। তারা আজ যে কথাগুলো বলছে, প্রকারান্তরে তাদের মূল রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে ধাবিত হওয়ার একটি অপকৌশল বলে মনে করি।’

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘হেফাজতের মধ্যে অধিকাংশই জামায়াতের লোক। মামুনুল হকের পিতা কে ছিল? তাদের অন্যরা কারা? আপস করে কখনও লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় না। রাজনীতিতে আজ যেটা শুরু হয়েছে, তা অশনি সংকেত। এটা বন্ধ করতে না পারলে, আমাদের সমস্ত শক্তি নিয়ে নামতে হবে। সনদ দেই আর যেভাবেই যতই খুশি করার চেষ্টা করি, তারা কিন্তু তাদের রাজনৈতিক দর্শন থেকে সরবে না। তারা যেখানে আছে সেখানেই থাকবে। তাদের খুশি করার কোনও সুযোগ নেই। রাজনীতির লক্ষ্যে পৌঁছাতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।’

সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে অব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গ টেনে বঙ্গবন্ধুর এই ঘনিষ্ঠ সহচর বলেন, ‘মেনন ভাই অনুষ্ঠানের অব্যবস্থাপনার কথা বলেছেন। এখানে একটা বিষয় আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে—যারা দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা সবাই যোগ্য। তারা কর্মঠ। কিন্তু তাদের কেউ কখনও বঙ্গবন্ধুকে দেখেননি। বঙ্গবন্ধু কেমন ছিলেন তারা জানেন না।’

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘মোদির সফরকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করে হেফাজত দাঁড়িয়ে গেছে। তারা রাষ্ট্রীয় উদযাপনকে চ্যালেঞ্জ করেছে। রাষ্ট্রীয় উদযাপনকে বিনা বাধায় যেতে দেবে না।’

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার চ্যালেঞ্জ যারা দিয়েছিল, তারা বহাল তবিয়তে রয়েছে। তারা কিছুতেই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী নির্বিঘ্নে পালন করতে দেবে না। এত বড় ঘটনা ঘটে গেলো, তালেবানদের অতীতের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়। ভবিষ্যৎ কী তা ভাবা দরকার। আগামী দিনে জঙ্গিবাদের উত্থান হবে কিনা তা ভাবতে হবে।’

সরকারের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘সমঝোতা কৌশলের নামে কখনও জামায়াতের সঙ্গে মিলেছি। কখনও রাগ করেছি। আজকে হেফাজতের সঙ্গে কখনও মিলে যাওয়া, কখনও রাগান্বিত দেখা যাচ্ছে। আমরা মৌলবাদী রাষ্ট্র হবো না অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হবো, সেটা ভাবতে হবে।’

হেফাজতের আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরিন আখতার বলেন, ‘সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠান শেষ করার মুহূর্তে দেশে একটি নারকীয় তাণ্ডবলীলা দেখলাম। এটা আমরা দেখতে চাই না। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে আমরা নির্মূল করতে পারিনি। হেফাজতের আন্দোলনকে যৌক্তিক বলে প্রমাণ করেছে বিএনপি। তারা তাদের সঙ্গে ছিল। এদের বিষয়ে চোখ বন্ধ করে থাকার সুযোগ নেই। দৃঢ়হস্তে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এদের বিরুদ্ধে ১৪ দলকে কর্মসূচিতে দিতে হবে।’

গণআজাদী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট এস কে সিকদার বলেন, ‘স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি বসে নেই। দলমত নির্বিশেষে শক্ত হাতে দমন করতে হবে। দমন করতে না পারলে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করে তাদের দমন করতে হবে।’

গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘ধর্মীয় লেবাসধারীরা বঙ্গবন্ধুর মুর‌্যালের ওপর আঘাত করেছে। রেল স্টেশনের ওপর আঘাত করছে। তারা এসব করছে পাকিস্তানি কায়দায়। এদের বরদাশত করা যাবে না। এদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। ঐক্যবদ্ধভাবে এদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।’
ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক হানা ও উসকানি দেশের রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। একজন রাষ্ট্রীয় অতিথিকে কেন্দ্র করে যারা দেশে তুলকালাম কাণ্ড করছে, তারা ষড়যন্ত্রকারী। তাদের কঠোর হস্তে দমনে প্রশাসনের দুর্বলতা রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। এদের কঠোর হস্তে দমন না করতে পারলে সামনের দিকে কী হবে, জানি না।’

তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে যারা দেখছি, তা কোনোভাবে কাম্য নয়। বিএনপি-জামায়াত কুচক্রী মহল বসে নেই। তারা ঐক্যবদ্ধভাবে সরকারকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য এবং প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে। বিএনপি-জামায়াত তাদের পেছনে আগেও কাজ করেছে, এখনও করছে।’

স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও কি আমাদের রাজাকারদের আস্ফালন দেখতে হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর মুর‌্যাল ভাঙার কথা উঠেছিল। তখন সরকার কী করেছে। হেফাজতের কার্যক্রমে মনে হয়েছে, ওরাই বাংলাদেশ। ওরাই দেশের একমাত্র আলেম। সরকারকে আগে ঠিক করতে হবে, তারা কী চায়? সরকার শক্ত অবস্থানে না গেলে আমাদের চিৎকার করে লাভ হবে না।’

জাতীয় পার্টি-জেপি মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি বা তাদের বংশধর বিলুপ্ত হয়েছে বলে বিশ্বাস করি না। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির মধ্যে বিভক্তি আছে। কিন্তু তাদের মধ্যে বিভক্তি নেই। পুরো বিষয়টির ব্যবস্থাপনায় কৌশলগত ভুল ছিল। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা থাকতে পারে। ভিভিআইপিদের নিরাপত্তার প্রতি বেশি জোর দেওয়ার কারণে হয়তো অন্যদিকটায় অবহেলা হয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘মুজিব চিরন্তরী অনুষ্ঠানে আমাদের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। তবে রাজনীতিবিদদের অবহেলা করা হয়েছে। তাদের প্রবেশ থেকে আসন বিন্যাস যথাযথ ছিল না। জাতীয় রাজনৈতিক নেতারা অবহেলার শিকার হয়েছেন। আশা করবো আয়োজকরা ভবিষ্যতে নজর দেবেন।’

কমিউনিস্ট কেন্দ্রের আহ্বায়ক ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান বলেন, ‘রাজাকার আলবদরসহ স্বাধীনতা বিরোধীরা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়।’

১৪ দলের নেতাদের সঙ্গে মোদির সাক্ষাৎ

ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরকালে তার সঙ্গে সাক্ষাতে ১৪ দলের প্রতিনিধি সিলেকশন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ওই সাক্ষাতে সব দলের প্রতিনিধিত্ব না থাকা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। কিন্তু আমরা জানতে পারিনি।’ ১৪ দলের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমুকে বিষয়টি নিয়ে ফোন দিয়েছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমু ভাই জানিয়েছেন, তারা একটি তালিকা পাঠিয়েছিলেন। এটা নাকি ভারতীয় হাইকমিশন সমন্বয় করেছে। একটি জোটের তালিকা এভাবে সমন্বয় করতে পারে কিনা আমার প্রশ্ন।’ কমিউনিস্ট কেন্দ্রের ওয়াজেদুল ইসলামও নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাতে তার দলের প্রতিনিধি না থাকার প্রশ্ন তোলেন।

নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ নিয়ে ওঠা প্রশ্নে প্রধান শরিক আওয়ামী লীগ থেকে কোনও জবাব দেওয়া না হলেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা দেন তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী। তিনি বলেন, ‘১৪ দলীয় জোটভুক্ত হিসেবে দাওয়াত দিয়েছে বলে মনে হয় না। এটা ছিল ইনডিভিজুয়াল। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের অনেক অনুষ্ঠানে যাই। মেনন ভাই, ইনু ভাইয়ের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক রয়েছে। সেটার জন্য হয়তো দাওয়াত পেয়েছি। আমি বহুবার তাদের অনুষ্ঠানে গিয়েছি। যার যেখানে সম্পর্ক সেখানে তাকে দাওয়াত দেবেন। যেমন দিলীপ বড়ুয়াকে চীন দাওয়াত দেবে, আমাকে দেবে না।’

দ্রব্যমূল্য নিয়ে আলোচনা

জাতীয় পার্টি-জেপি’র মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম তার বক্তব্যকালে জিনিসপত্রের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘মাত্র শবে বরাত এলো। এরইমধ্যে দ্রব্যমূল্য অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। তোফায়েল আহমেদ যখন বাণিজ্য মন্ত্রী ছিলেন, তিনি আগে থেকেই কিছু ব্যবস্থা নিয়ে রাখতেন। সে কারণে রমজানে জিনিসপত্রের দাম বাড়তো না। এখন সেই ধরনের ব্যবস্থা দেখছি না। এগুলো দেখতে হবে। জনগণের সংকট মোকাবিলায় সরকারকে বেশিমাত্রায় উদ্যোগী হয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’

জাসদের শিরিন আখতার বলেন, ‘সাম্প্রতিককালে দ্রব্যমূল্য বেড়ে চলছে। শবে বরাতের আগে জিনিসের দাম বেড়েছে। রমজান তো আরও ১৫ দিন পরে। এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া দরকার। সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের বলবো, আপনারা কিন্তু বাস্তবকে অস্বীকার করছেন। এখনই এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
সূত্রঃ বাংলা ট্রিউবিউন

শেয়ার করুন