হাসপাতালে এক মাসের ব্যবধানে করোনা রোগী বেড়েছে দ্বিগুণ

দেশে করোনার সংক্রমণ আবারও বাড়ছে। দেশে গত প্রায় তিন সপ্তাহ ধরেই নতুন করে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ছে। মাঝে বেশ কয়েক মাস শনাক্ত ও মৃত্যুর হার কমতির দিকে থাকলেও এখন আবার ঊর্ধ্বমুখী। অবস্থা ভয়ংকর আকার ধারণ করলেও বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা মানছেন না অনেকেই। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দেশের সব হাসপাতালে করোনা রোগীর চাপ দ্বিগুণ বাড়ার বিষয়টি তারই প্রমাণ বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

মহামারি করোনার একবছর পূর্ণ হয়েছে। গত বছর এই সময়ে যত লোক আক্রান্ত হয়েছে ঠিক এই বছরের তার চেয়ে অনেক বেশি লোক আক্রান্ত এবং মৃত্যু হয়েছে। করোনার মধ্যে মানুষের চলাফেরার সচেতনা নেই বললেই চলে। এক বছর আগে আগে যতটা মানুষ সচতেন ছিলো এখন তা নেই বললেই চলে। পুরাদমে চলছে মিছিল মিটিং, সভা সমাবেশ, নির্বাচন, মেলা কিংবা পরীক্ষা। মানুষের মধ্যে সামাজিক দূরুত্ব এবং মাস্ক পড়ারা কোনটা এখন নেই বললে চলে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসের ১৯ তারিখ একদিনে যেখানে করোনায় মৃত্যু হয়েছিল ৮ জনের, সেখানে ঠিক এক মাস পর ১৯ মার্চ মৃত্যু হয়েছে ১৮ জনের। একই ভাবে হাসপাতালে সাধারণ ও আইসিইউ শয্যায় রোগীর সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করাতেই করোনা নিয়ে আবারো মহাসংকটে পড়তে যাচ্ছে দেশ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শেষ এক সপ্তাহে (১৪-২০ মার্চ) দেশে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ১২ হাজার ৪৭০ জন। অথচ তার আগের সপ্তাহে শনাক্ত হয়েছিল ৬ হাজার ৫১২ জন। অন্যদিকে শেষ এক সপ্তাহে করোনায় মারা গেছে ১৪১ জন। আগের সপ্তাহে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৭৬ জন। শতকরা হিসাবে শেষ সপ্তাহে শনাক্ত বেড়েছে প্রায় ৯১ শতাংশ ও মৃত্যু বেড়েছে ৮৬ শতাংশ।

গত বছরের মার্চে দেশে প্রথম করোনা শনাক্তের পর গতকাল ছিল ৩৭৮তম দিন। গত বছরের ৮ই মার্চ আর প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিলো এর ১০ দিন পর, ১৮ই মার্চ। এর আগে ২০১৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর চীনের উহান শহরে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের তথ্য প্রকাশ করা হয় এবং ২০২০ সালের ৪ঠা জানুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চীনে ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাবের কথা ঘোষণা করে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ৪ঠা জানুয়ারি থেকেই দেশের বিমানবন্দরসহ সব স্থল ও নৌবন্দরে বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের স্ক্রিনিং শুরু করে। পহেলা মার্চ সব সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে শয্যা সংখ্যার আনুপাতিক হারে আইসোলেশন ইউনিট খোলার নির্দেশ দেয়া হয় এবং ৪ঠা মার্চ সমন্বিত করোনা কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়। এর সাতদিন পর ৮ই মার্চ দেশের প্রথম করোনা সংক্রমিত ব্যক্তি শনাক্তের পর তা দ্রুত নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুরের শিবচর ও ঢাকার মিরপুরে ছড়িয়ে পড়ে।

গত বছর ১৮ই মার্চ মাত্র দশটি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিলো আর তাতে পজিটিভ হয়েছিলেন ৪ জন। পরদিন ১৯শে মার্চ স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিত ব্রিফিং-এ প্রথম কোন ব্যক্তির মৃত্যুর কথা জানায় অর্থাৎ করোনায় সংক্রমিত হয়ে ১৮ই মার্চ ওই ব্যক্তি মারা গিয়েছিলেন।সেদিনই জানানো হয়েছিলো যে নতুন করে ১৬টি আরটি পিসিআর মেশিন ক্রয় করার প্রক্রিয়া চলছে যার মধ্যে সাতটি দ্রুত পাওয়া যাবে। এছাড়া চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্য কর্মীদের জন্য ৬ হাজার সেট পিপিই মজুত আছে এবং এর আগে আরও প্রায় সাত হাজার পিপিই হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ করা হয়েছিলো বলে জানানো হয়েছিলো। ওদিকে গত বছর মার্চে সরকারি হাসপাতালে ৫০৮টি আইসিইউ শয্যা ও বেসরকারি হাসপাতালে ৭৩৭টি আইসিইউ শয্যা ছিলো এবং ভেন্টিলেটর ছিলো ১৬৪টি।

সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ওই সময় দেশে সরকারি হাসপাতালে ৬৫৪টি এবং এসব হাসপাতালে মোট শয্যার সংখ্যা ছিলো ৫১,৩১৬টি। আর বেসরকারি হাসপাতাল ছিলো ৫,০৫৫টি, যেখানে মোট শয্যার সংখ্যা ছিলো ৯০ হাজার ৫৮৭টি। তখন ঢাকায় আইসোলেশন শয্যা ছিলো ১ হাজার ৫০টি । আর ঢাকা মহানগরীর বাইরে ঢাকার অন্যান্য জেলায় আইসোলেশন বিছানার সংখ্যা ২২৭, চট্টগ্রামে ৪৪১, রাজশাহীতে ৫৫৮, বরিশালে ৪২৯, রংপুরে ৫২৫, সিলেটে ৬৬৪, ময়মনসিংহ ৯০, খুলনায় ৫৩১। সরকারি স্বাস্থ্যখাতে কর্মরত মোট চিকিৎসকের সংখ্যা ছিলো ২৫ হাজার ৬১৫ জন। আর চিকিৎসক, সেবিকা ও নানা পর্যায়ের হাসপাতাল কর্মী মিলে মোট জনবল কর্মরত রয়েছেন ৭৮ হাজার ৩০০ জন। মূলত এরপর থেকে ক্রমাগত নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা বাড়ানোর চেষ্টা চালাতে থাকে স্বাস্থ্য বিভাগ।

পহেলা এপ্রিল ব্রিফিং এ জানানো হয়েছিলো যে ছয়টি প্রতিষ্ঠানে কোভিড পরীক্ষায় মোট ১৫৭ জনের কোভিড-১৯ পরীক্ষা হয়েছে। ওই দিন পর্যন্ত ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৪৫০টি পিপিই এবং ২১০০০ পিসিআর কিটস বিতরণের তথ্য দেয়া হয়। একই সঙ্গে করোনা চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে ওই দিন ২০ হাজার ২৪৭ চিকিৎসক নিবন্ধিত হয়েছিলো ।পহেলা এপ্রিল ছয়টি প্রতিষ্ঠানে পিসিআর পরীক্ষা হয়েছে আর পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত ছিলো আরও ছয়টি প্রতিষ্ঠান। আর প্রথম মৃত্যুর দু’মাস পর ১৮ই মে স্বাস্থ্য বিভাগ ৪২টি প্রতিষ্ঠানে ৯৭৮৮টি নমুনা পরীক্ষার খবর দেয়। ওই দিন জানানো হয় যে প্রায় বিশ লাখ পিপিই বিতরণ করা হয়েছে এবং মজুদ আছে আরও প্রায় চার লাখ। এর দু’মাস পর ১৮ই জুলাই মোট ৮০টি পরীক্ষাগারে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষায় মোট ১০ হাজার ৯২৩টি নমুনা পরীক্ষার কথা জানিয়েছিলো স্বাস্থ্য বিভাগ।

স্বাস্থ্য বিভাগের হিসেবে এখন ১৬৩টি কেন্দ্রে কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ পরীক্ষা হচ্ছে যার মধ্যে আরটি পিসিআর ল্যাবরেটরি আছে ১১৮টি। তবে এর মধ্যে সরকারি ল্যাব আছে মাত্র ৫১টি। সব মিলিয়ে এ মূহুর্তে সারাদেশে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে মোট ১০ হাজার ৩০৫টি সাধারণ শয্যা ও ৫৫৮টি আইসিইউ শয্যা আছে। পাশাপাশি এখন দেশে অক্সিজেন সিলিন্ডার আছে ১২ হাজার ৭৭৩টি। আর হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা আছে ৭১৫টি এবং অক্সিজেন কনসেনট্রেটর আছে ৬৬০টি।

তবে কোভিড ও নন-কোভিড মিলিয়ে এ মূহুর্তে অক্সিজেন সিলিন্ডার আছে ২৪ হাজার ৭১১টি, আইসিইউ ৬৮৮ এবং ভেন্টিলেটর আছে ৬২০টি। আর ১১৮টি প্রতিষ্ঠানে আরটি পিসিআর টেস্ট করার তথ্য দেয়া হয়েছে ১৭ই মার্চ পর্যন্ত যাতে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ২৪ হাজার ২৭৫টি। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে এ সময়ের মধ্যে নতুন করে ২ হাজার চিকিৎসক ও ৪ হাজার নার্স নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এছাড়া সারা দেশে ৫ হাজার ১০০ ডাক্তার ও ১ হাজার ৭০০ নার্সকে করোনা ভাইরাস ব্যবস্থাপনা ও ইনফেকশন প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। ১৭ই মার্চ পর্যন্ত দেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৩৩ লাখ ৪ হাজার ৮৫৭টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে আর বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হয়েছে ১০ লাখ ২৩ হাজার ৪১২টি।

করোনায় আক্রান্ত ও করোনার উপসর্গের রোগী লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মন্তব্য করে জনস্বাস্থ্যবিদ ও প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, হাসপাতালে খালি শয্যা পাওয়া যাচ্ছে না। অধিকাংশ আইসিইউতে বেড নেই। মহাদুর্যোগ দরজায় আবার কড়া নাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রধান অস্ত্র হলো, মাস্ক পরা, স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং করোনার টিকা নেওয়া। নয়তো প্রতিটি অবহেলার দায় শোধ করতে হতে পারে। দেশের কোভিড ডেডিকেটেড অন্যতম হাসপাতাল কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল। এই হাসপাতালের আইসিইউ কখনোই শূন্য থাকেনি, তবে রোগীদের ওয়েটিং লিস্ট ( অপেক্ষমাণ তালিকা) কমে এসেছিল। এই হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র ( আইসিইউ)-এর প্রধান ডা. শাহজাদ হোসেন মাসুম বলেন, আইসিইউর ওয়েটিং লিস্ট বড় হচ্ছে আর ওয়ার্ডে ভর্তি পিকে চলে গেছে। আমাদের ক্যাপসিটি প্রায় আমরা ক্রস করে চলে গেছি। আইসিইউ থেকে অনেক রোগীকে কেবিনে স্থানান্তর করতে পারতাম অর্থাৎ তারা সুস্থ হতেন, ভালোর দিকে যেতেন; কিন্তু এখন রোগীরা খারাপ হয়ে যাচ্ছে বেশি বলেন তিনি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ রিদওয়ানুর রহমান বলেন, বর্তমানে এই মুহূর্তে এটাকে করোনার সেকেন্ড ওয়েব বলা যায়। যারা এখনো করোনা আক্রান্ত হয় নাই, যারা হয়ে ভালো হয়ে গেছে, যারা ভ্যাকসিন নিয়েছে, যারা নেই সবাই এখন ঝুঁকির মধ্যে। বর্তমানে নীতিনির্ধারকরা করোনাকে গুরুত্বই দিচ্ছে না। টোটাল লকডাউন না করে যে এলাকাগুলোতে করোনার সংক্রমণ বেশি, সে এলাকাগুলো যদি বন্ধ রাখা যায়, তাহলে সংক্রমণ কিছুটা কমানো যাবে।’ স্বাস্থ্য অধিদফতরে রোগনিয়ন্ত্রণ পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, এরই মধ্যে ব্রিটেনের নতুন ধরনের করোনার অস্তিত্ব মিলেছে দেশে ১৬ জনের দেহে। সংক্রমণ এভাবে বাড়তে থাকলে জনসমাগম বন্ধ করতে সরকারকে পরামর্শ দেবেন তারা।

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১২৬ রোগীকে আইসোলেশনে এবং ৫৭৪ জনকে কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে আইসোলেশনে ১০ হাজার ২১ এবং কোয়ারেন্টাইনে আছে ৩৩ হাজার ৭৪ জন। সারা দেশে কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোয় ১০ হাজার ৪৩৭টি সাধারণ বেডের মধ্যে গতকাল রোগী ভর্তি ছিল ২ হাজার ৬৫০টিতে। বাকিগুলো খালি ছিল। এ ছাড়া ৫৬৩টি আইসিইউর মধ্যে এদিন রোগী ভর্তি ছিল ৩০১টিতে।

শেয়ার করুন