হাওরের নৌকা চলছে শহরে

সুনামগঞ্জ শহর ও শহরতলির অন্তত ২০ হাজার মানুষের যাতায়াতে এখন ভরসা ছোট নৌকা কিংবা কলাগাছের ভেলা। এসব মানুষের অনেকের ঘরে কোমর সমান পানি। কারও কারও ঘর থেকে বের হলেই গলা সমান পানি। গত ২৭ জুন থেকে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন এসব মানুষ। নদীর পানি কমলেও এই এলাকার মানুষের দুর্ভোগ শেষ হয়নি।

শহরের শান্তিবাগ আবাসিক এলাকার বিপ্লব তালুকদার বলেন, ‘ঘরে হাটু সমান পানি, সড়কে এর চেয়ে একটু বেশি। দুদিন আগে আরও বেশি ছিল। মঙ্গলবার সকালে কিছুটা কমেছে। এলাকার মানুষ নৌকা ছাড়া চলাচলের উপায় নেই।’

এই এলাকার ইকবাল হোসেন বলেন, ‘২৭ জুন থেকে পানিবন্দি জীবন। মাঝখানে দুই-চার দিন রিকশা দেখেছি মহল্লায়, এখন দেখছি নৌকা। পৌরসভার টিউবওয়েলের মুখ খুলে রেখেছি। কে কীভাবে পানি খাচ্ছে জানি না।’

কেবল শান্তিবাগ আবাসিক এলাকা নয়। সুনামগঞ্জ শহরের কালীপুর, পশ্চিম হাজীপাড়া, ওয়েজখালী, বড়পাড়া, পশ্চিম তেঘরিয়া, উত্তর আরপিননগর, জেল রোড, ষোলঘর, পূর্ব, পশ্চিম নতুনপাড়া, শান্তিবাগ, বাঁধনপাড়া, শহীদ আবুল হোসেন রোড, দফ এলাকা, নতুন হাসননগর, সুলতানপুর, আপ্তাবনগর ও নবীনগর এলাকায় পৌরসভার সড়কের উপর দিয়ে চলছে ছোট ছোট নৌকা। কেউ কলাগাছের ভেলাও ব্যবহার করছেন। শহরের এসব বাসিন্দাদের নৌকা নেই। এলাকার দিনমজুরদের কেউ কেউ নৌকা ভাড়া এনে এখানকার বাসিন্দাদের আনা নেওয়ার কাজ করছেন। আবার অন্য এলাকার শ্রমিকরাও নৌকা নিয়ে এসেছেন এখানে।

দুর্ভোগে থাকা মানুষগুলো জানান, প্রথম দফা বন্যার পানি ৫-৬ দিন পর নামলেও এবারের পানি নামছে ধীরগতিতে। এ কারণে দুর্ভোগ বেড়েছে।

শান্তিবাগ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা বিল্টু দেব বলেন, ‘মানুষ কষ্ট সহ্য করে ঘরেই আছেন। করোনার ভয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছে না তারা। তবে হতদরিদ্র কিছু মানুষ শহরের সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে উঠেছে।’

জেলা ত্রাণ ও পূনর্বাসন কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত জেলার ১১ উপজেলার বন্যা দুর্গতদের মধ্যে ৮৬৫ মে. টন চাল, নগদ ৪৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা, এক হাজার ৯০০ পেকেট শুকনো খাবার, ২ লাখ টাকার শিশু খাদ্য এবং ২ লাখ টাকার গোখাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত জেলায় ৩৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু রয়েছে।

এদিকে, সুনামগঞ্জের বন্যা দুর্গতদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় বন্যা কবলিত প্রায় এক হাজার পরিবারের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে শুকনো খাবার বিতরণ করেছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীমা শাহরিয়ার।

মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়নের ব্রজনাথপুর, বাঘমারা, দুর্গাপুর, ধরেরকান্দা গ্রামে এই খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা কৃষকলীগের সভাপতি আব্দুল কাদির শান্তি মিয়া, উপজেলার কৃষকলীগের আহবায়ক হুমায়ূন কবীর মৃধা, যুগ্ম-আহবায়ক রুকন মিয়া, আব্দুল কাহার, জামাল হোসেন প্রমুখ। বন্যার্তদের মধ্যে চিড়া, মুড়ি, গুড়, খাবার স্যালাইন দেওয়া হয়।

এর আগে সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের লালপুর গ্রামের শতাধিক পরিবারের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. শামীমা শাহরিয়ার।

এদিকে, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ মঙ্গলবার সকাল থেকে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ পৌঁছে দেন। এর আগে সোমবার বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুরের কয়েকটি গ্রামে ও আশ্রয়কেন্দ্রে বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ পৌঁছে দেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ।

ওদিকে, উজানে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় পাহাড়ী নদীসহ সুরমা নদীর পানি কমেছে। তবে মঙ্গলবার বিকেল ৩ টা পর্যন্ত পানি সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ পয়েন্ট দিয়ে বিপদ সীমার ১৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

নদীর পানি কমলেও হাওরেও জনবসতিতে পানি বেড়েছে। এ কারণে দুর্ভোগ বেড়েছে এসব এলাকায়। টিউবওয়েল ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট, হাওরের আফালের ঢেউ থেকে বাড়ি রক্ষা, নদীর পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে নদী ভাঙনের তীব্রতা থেকে গ্রাম জনবসতি রক্ষার লড়াই করছেন হাওরপাড়ের মানুষ।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সবিবুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় উজানে এবং সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। এজন্য নদীর পানির উচ্চতা কমেছে। সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জানান, জেলাব্যাপী বন্যা দুর্গতদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়েছে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

এই বিভাগের আরো খবর
মন্তব্য
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: