রায়হান হত্যাকাণ্ড, ফাঁড়িতে সোয়া ৩ ঘণ্টা কী ঘটেছিল

সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রায়হানকে নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানেই রায়হান মারা যান। সিসিটিভির ফুটেজে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্যের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত দল। সিলেট মহানগর পুলিশের একটি বিশ্বস্ত সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, সিসিটিভির ফুটেজ অনুযায়ী শনিবার রাত ৩টা ৯ মিনিটে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে আনা হয় রায়হানকে। এ সময় তিনি হেঁটে পুলিশের সঙ্গে ফাঁড়িতে ঢোকেন। এর প্রায় তিন ঘণ্টা পর সকাল ৬টা ২৪ মিনিটে দুই পুলিশের কাঁধে ভর করে রায়হানকে অটোরিকশায় তুলে ওসমানী হাসপাতালে নেয়া হয়। সেই অনুযায়ী রায়হানকে ফাঁড়িতে সোয়া ৩ ঘণ্টা নির্যাতন করা হয়। হাসপাতালে নেয়ার কিছুক্ষণ পরেই রায়হান মারা যান।

সূত্র আরো জানায়, সোমবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ সেই সময় দায়িত্বে থাকা সাত পুলিশ সদস্যকে। ইনচার্জ আকবর প্রথমে রায়হানকে ফাঁড়িতে নেয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। পরে সিলেটের এসপি কার্যালয়ে থাকা সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে তদন্ত কমিটি। সেই ফুটেজ দেখানোর পর সবাই মুখ খুলতে শুরু করেন।

ঘটনায় প্রাথমিকভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে সোমবার ফাঁড়ি ইনচার্জ আকবরসহ চার পুলিশকে সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

বিশ্বস্ত সূত্রটি জানায়, ইনচার্জ আকবরসহ অন্যরা তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছে শনিবার রাত আড়াইটার দিকে দুইজন লোক সোবহানীঘাট থেকে কাষ্টঘর রোড দিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে সুইপার কলোনির গেটের পাশে তারা ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন। ছুরি দিয়ে ট্রাউজারের পকেট কেটে তাদের টাকা-পয়সা নিয়ে পাশের সুইপার সুলাই লালের ঘরে ঢুকে যান তিন ছিনতাইকারী। এরপর ছিনতাইয়ের শিকার লোকজন মহাজনপট্টি দিয়ে বের হয়ে নগরীর বন্দরবাজারের মশরাফিয়া রেস্টুরেন্টে দুই পুলিশকে (কোতোয়ালি থানার মুন্সি ও এক অপারেটর) নাশতা করতে দেখেন।

তারা পুলিশকে ছিনতাইয়ের বিষয়টি জানান। পুলিশ ইকো-১-কে মোবাইলে কল দিয়ে এ খবর জানায়। এরপর এএসআই আশিক এলাহীর টিমকে খবর পাঠান ইকো-১-এর ওয়্যারলেস অপারেটর কনস্টেবল আবু তাহের। টিমের অন্য সদস্যরা হলেন- কনস্টেবল তৌহিদ মিয়া ও হারুনুর রশিদ। তারা ঘটনাস্থল থেকে ভুক্তভোগীর উপস্থিতিতে রায়হানকে আটক করেন। রায়হানের সঙ্গে থাকা দুইজন দৌড়ে পালিয়ে যান। পরে রায়হানকে ফাঁড়িতে নিয়ে আসা হয়।

এ সময় এএসআই আশিক এলাহী ছিনতাইয়ের শিকার লোকের নাম-পরিচয় রাখেননি বলে তদন্ত কমিটিকে জানান। ফাঁড়িতে নিয়ে আসার পর এসআই আকবরের নেতৃত্বে রায়হানকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। তার নির্দেশেই তৌহিদের ফোনে রায়হান তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে ১০ হাজার টাকা নিয়ে আসতে বলেন।

এর আগে রোববার রায়হানের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে এসএমপির উপ-কমিশনার (ডিসি-উত্তর) আজবাহার আলী শেখের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- এসএমপির এডিসি (ক্রাইম দক্ষিণ) এহসানুদ্দিন চৌধুরী, এডিসি (ক্রাইম উত্তর) শাহরিয়ার আল মামুন ও এসি (এয়ারপোর্ট) প্রভাশ কুমার সিং।

রোববার সকালে রায়হানের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর পুলিশ জানায়, ছিনতাইয়ের সময় গণপিটুনিতে রায়হান মারা যান। তবে নিহতের পরিবারের দাবি, পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতন করে রায়হানকে মেরে ফেলা হয়েছে। এ ঘটনায় রোববার রাত আড়াইটার দিকে এসএমপির কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন নিহতের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি।

মামলার পর সোমবার বিকেলে বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করে এসএমপির পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়।

সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা চার পুলিশ সদস্য হলেন- বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া, কনস্টেবল হারুনুর রশিদ, তৌহিদ মিয়া ও টিটু চন্দ্র দাস। আর প্রত্যাহারকৃত তিন পুলিশ সদস্য হলেন এএসআই আশেক এলাহী, এএসআই কুতুব আলী ও কনস্টেবল সজিব হোসেন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

এই বিভাগের আরো খবর
মন্তব্য
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: