যে কারণে ৯ বছরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাল স্বর্ণের দাম

করোনা ভাইরাসের প্রকোপের কারণে কয়েক মাস ধরেই বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ নিরাপদ বিনিয়োগের জন্য স্বর্ণ কিনে মজুদ করছেন। এর মধ্যেই করোনা ভাইরাস মোকাবিলা করা নিয়ে চীনের কঠোর সমালোচনা করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। এ পরিস্থিতিতে সম্প্রতি দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে দুই পরাশক্তির মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে,

যার প্রভাব গিয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে। ফলে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে স্বর্ণের দাম। আর এর পেছনে প্রধান কারণ হলো চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা। আন্তর্জাতিক বাজারে গতকাল সোমবার ইতিহাসে দ্বিতীয়বার প্রতি আউন্স স্বর্ণের দামে এক হাজার ৮২০ ডলার স্পর্শ করেছে।

এর মধ্য দিয়ে গত ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে স্বর্ণের দাম। সোমবার (২০ জুলাই) লেনদেনের একপর্যায়ে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম এক হাজার ৮২০ ডলারে উঠে যায়। এর মাধ্যমে প্রায় ৯ বছর বা ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম এক হাজার ৮২০ ডলার স্পর্শ করল। যদিও দিনের লেনদেন শেষে তা এক হাজার ৮১৮ ডলারে থিতু হয়।

গত বছরের শেষের দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ছিল এক হাজার ৪৫৪ ডলার। এরপর করোনা ভাইরাসের প্রকোপের মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে এক হাজার ৬৬০ ডলারে উঠে যায়। তবে মার্চে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন হয়। এক ধাক্কায় দাম কমে প্রতি আউন্স এক হাজার ৪৬৯ ডলারে নেমে আসে।

মার্চে দরপতন হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ঘুরে দাঁড়াতে বেশি সময় নেয়নি। হু হু করে দাম বেড়ে মে মাসে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম এক হাজার ৭৪৮ ডলারে উঠে যায়। জুন মাসজুড়ে স্বর্ণের দাম এক হাজার ৮০০ ডলারের আশপাশে ঘুরপাক খায়। চলতি মাসের প্রথম অর্ধেকেও প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম এক হাজার ৭৯০ থেকে এক হাজার ৮১০ ডলারের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। তবে সম্প্রতি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা স্বর্ণের দামের পালে নতুন করে হাওয়া লাগিয়েছে।

কিছুদিন আগে চীন দক্ষিণ চীন সাগরের একটা অংশ বন্ধ করে দেয় প্যারাসেল দ্বীপের চারপাশের সমুদ্রে নৌবাহিনীর মহড়া চালানোর জন্য। এতে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বলে, চীন বিতর্কিত ওই এলাকায় উত্তেজনা ছড়াতে পারে এমন কর্মকাণ্ড না চালানোর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ওই এলাকায় তার নৌশক্তির প্রদর্শন আরো জোরদার করে আরো রণতরী সেখানে মোতায়েন করে, যা চীনকে স্বভাবতই ক্ষুব্ধ করে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল খুবই স্পষ্ট।

মার্কিন নৌবাহিনী ওই এলাকায় তাদের উপস্থিতি আরো জোরদার করায় দক্ষিণ চীন সাগরে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মধ্যে বৈরিতা দ্রুত বেড়েছে এবং কিছু একটা ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চীন ও ভারতের মধ্যে বিতর্কিত সীমান্তে সম্প্রতি যে প্রাণঘাতী সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে, হংকংয়ে যেভাবে চীন জাতীয় নিরাপত্তা আইন জারি করেছে, তাতে অনেকেই মনে করছেন দক্ষিণ চীন সাগরে কোনোরকম হুমকি দেখা দিলে তা মোকাবিলায় চীন হয়তো সংযত আচরণ না-ও দেখাতে পারে।

দক্ষিণ চীন সাগর গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল পথ। তবে বহু বছর ধরে এই সাগরের ছোট ছোট অসংখ্য দ্বীপ, যার অনেকগুলোই প্রবাল দ্বীপ, প্রবাল প্রাচীর এবং দ্বীপগুলোর সম্পদের মালিকানা দাবি করে আসছে ওই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশ এবং অনেক দিন ধরেই এই সাগর ওই অঞ্চলে একটা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন এই এলাকায় তাদের মালিকানার দাবি নিয়ে ক্রমশ আরো বেশি সোচ্চার হয়ে উঠেছে। দেশটি দাবি করছে, বিতর্কিত এই এলাকাটি কয়েক শতাব্দী ধরে চীনের অংশ এবং চীন তাদের দাবির সমর্থনে সেখানে সামরিক উপস্থিতি ক্রমান্বয়ে আরো জোরদার করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক কমান্ডের সাবেক অধিনায়ক অ্যাডমিরাল হ্যারি হ্যারিস একসময় এটাকে উল্লেখ করেছিলেন ‘বালুর সুবিশাল প্রাচীর’ হিসেবে। তিনি বলেছিলেন, চীনের ঐতিহাসিক প্রাচীর গ্রেট ওয়াল যেমন চীনা ভূখণ্ডকে সুরিক্ষত রাখার জন্য তৈরি হয়েছিল, তেমনি সাগরে ওই এলাকাকে সুরক্ষিত করতে চীন জায়গাটি ঘিরে তৈরি করেছে ‘বালুর প্রাচীর’।

দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তীক্ষ্ন বাদানুবাদ হলেও দুই দেশ এই বিরোধপূর্ণ এলাকা নিয়ে তাদের মতভেদ এত দিন পর্যন্ত এক অর্থে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সংঘাতের মধ্যেও ওই এলাকার মালিকানা নিয়ে আঞ্চলিক বিবাদে কোনো পক্ষ নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। তারা শুধু ওই অঞ্চলে তাদের জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা দাবি করে এসেছে। তবে করোনা প্রাদুর্ভাব চীন প্রথমদিকে কীভাবে মোকাবিলা করেছে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা চীনকে ক্ষুব্ধ করেছে। সব মিলিয়ে দুই শক্তিধর দেশের মধ্যকার উত্তাপ এখন ছড়িয়ে পড়েছে দক্ষিণ চীন সাগরেও।

এদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২২ জুন বাংলাদেশে দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)। সাধারণত ভরিতে এক-দেড় হাজার টাকা করে বাড়ানো হলেও এবার এক লাফে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম পাঁচ হাজার ৭১৫ টাকা বাড়ানো হয়। অবশ্য দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানোর পরে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্সে ২০ ডলারের ওপরে বেড়েছে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

এই বিভাগের আরো খবর
মন্তব্য
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: