যেসব কারণে নারীরা যৌনজীবনে অতৃপ্ত হয়ে থাকেন!

দেখা গেছে নারীরা পুরুষের তুলনায় যৌন জীবনে কিছুটা বেশি অসুখী হয়ে থাকে। এর বাস্তব কারণও রয়েছে অনেক। দেখা যায় নিজের ভালোবাসার পুরুষটির সাথেও যৌন জীবন নিয়ে খুশি নন প্রচুর নারী। মুখে প্রকাশ না করলেও মনের মাঝে একটা চাপা ক্ষোভ নিয়ে জীবন যাপন করেন টানা, মুখ ফুটে অনেকেই বলতে পারেন না যৌন জীবনে নিজের অতৃপ্তির কথা। কিন্তু এটা কেন? কেন প্রচুর নারী রয়ে যান যৌন জীবনে অসুখী ও অতৃপ্ত?

ভুল ধারণা ও অজ্ঞতা নারীদের যৌন জীবনে অসুখী রয়ে যাওয়ার মূল কারণ হচ্ছে পর্যাপ্ত যৌন শিক্ষার অভাব। যৌনতা যে কেবল সন্তান উৎপাদনের মাধ্যম নয়, নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই একটি আনন্দের ব্যাপার- এই ব্যাপারটি সম্পর্কে আজও অজ্ঞ প্রচুর নারী। কী করতে হবে বা কীভাবে করলে আরও আনন্দময় হয়ে উঠবে যৌন মিলন, সেটা জানা নেই বলে তাঁরা রয়ে যান অসুখী ও অতৃপ্ত।

নিজেকে বুঝতে না পারা আসলে কী চাইছেন, তার শরীর কোন জিনিসে কীভাবে সাড়া দিচ্ছে, কোন অঙ্গগুলো যৌনতার ক্ষেত্রে স্পর্শকাতর বা নিজের শরীরের চাহিদাগুলো কী কী ইত্যাদি বিষয়ে অজ্ঞতা বা বুঝতে না পারাও যৌন জীবনে অসুখী হবার একটি বড় কারণ। যেমন ধরুন, প্রচুর নারীই জানেন না যে ক্লাইটোরিস কী বা যৌন জীবনে এর প্রভাব কী।

কী চান সেটা বলতে না পারা নিজেকে বুঝতে পারেন, নিজের চাহিদাও জানেন, কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারছেন না নিজের ভালো লাগা না লাগার কথা। নারীদের যৌন জীবনে অতৃপ্ত থাকার অন্তরালে এটা একটি বিশাল কারণ। এমনকি তিনি যে যৌন জীবনে সুখী নন, এটাও পুরুষ সঙ্গীকে মুখ ফুটে বলতে পারেন না অনেক নারী।

লজ্জা ও সংকোচ অনেক নারীই মনে করেন যে মেয়েদের যৌনতার কথা বলতে নেই, কিংবা মেয়েদের যৌনতার বিষয়টি নিয়ে কথা বল বা যৌন চাহিদা প্রদর্শন করার বিষয়টি খুবই লজ্জার। তাই মনের ইচ্ছা মনেই চেপে রাখেন তাঁরা।

পুরুষ সঙ্গীর স্বার্থপরতা বেশিরভাগ পুরুষই নিজের সঙ্গীনির যৌন চাহিদা পূরণের ব্যাপারে মনযোগী নন। বরং নিজের চাহিদা মিটে গেলেই তাঁরা স্বার্থপরের মত আচরণ করতে শুরু করেন। এটাও নারীদের অতৃপ্ত থাকার একটি বড় কারণ।

অরগাজম সম্পর্কে ভুল ধারণা অরগাজম বা চূড়ান্ত সুখ যে কেবল পুরুষের জন্য নয়। নারীরাও যে অরগাজম লাভ করতে পারেন এবং সেটা পুরুষদের মতই প্রত্যেক মিলনে, এই ব্যাপারটি জানেন না প্রচুর নারী। কীভাবে অরগাজম লাভ সম্ভব, কোন পজিশনে মিলিত হলে অরগাজম সহজে আসে ইত্যাদি বিষয়ে অজ্ঞতার কারণে নারীরা রয়ে যান অসুখী।

যৌনতা ঘিরে ভয় অনেক নারীর মাঝেই যৌনতা বিষয়ে নানান রকমের ভীতি কাজ করে। ফলে এই বিষয়টি সম্পর্কে তাঁরা কখনো সহজ মনোভাব পোষণ করতে পারেন না, চিরকাল বিষয়টি নিয়ে আড়ষ্টতা রয়ে যায়।

শারীরিক-মানসিক সমস্যা নিয়ে সংকোচ যৌনতায় আগ্রহ নেই বা যৌনতা ঘিরে কোন শারীরিক সমস্যা বোধ করছেন? এমন অবস্থায় অভিজ্ঞ কোনো হোমিও ডাক্তারের কাছে যান না অধিকাংশ নারী। ফলে সামান্য একটু চিকিৎসার অভাবেই তাঁদের যৌন জীবন রয়ে যায় বিভীষিকাময়। অথচ প্রপার হোমিও ট্রিটমেন্ট নিলে নারী ও পুরুষের যৌন সংক্রান্ত সমস্যাসমূহ অল্প সময়ের মধ্যেই নির্মূল হয়ে যায়।

অরগাজমের সাথে পরিচয় নেই।
যৌন মিলনের শেষ পর্যায় হচ্ছে অরগাজম বা চরম তৃপ্তি। নারীদের জন্য অরগাজম একেবারেই অন্য রকম একটা অনুভব। আপনার পরিচিত অন্য কোন অনুভবের সাথে এটার মিল খুঁজে পাবেন না। হ্যাঁ, এ কথা সত্যি যে আমাদের দেশে বিপুল সংখ্যক নারীর অরগাজমের সাথে পরিচয় নেই। এমনকি তাঁরা জানেন পর্যন্ত না অরগাজমের ব্যাপারে। কেননা পুরুষের চাইতে নারীর অরগাজমটা একটু ভিন্ন। পুরুষের অরগাজম যত সহজে আসে, নারীর ক্ষেত্রে তেমনটা হয় না। নারীর অরগাজমে সময় ও যৌন মিলনের সঠিক পজিশন প্রয়োজন।

পুরুষ যেমন বীর্যপাতের কয়েক মুহূর্ত আগে টের পান, নারীর ক্ষেত্রেও তাই। যৌন মিলনের সময় অরগাজম হবার কয়েক মুহূর্ত আগেই বুঝতে পারবেন যে চরম মুহূর্ত উপস্থিত হতে যাচ্ছে। আপনার হার্ট বিট বেড়ে যেতে শুরু করবে, মুখে রক্ত জমবে, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে যাবে, কেউ কেউ ঘামতেও শুরু করবেন।

তবে সবচাইতে নিশ্চিত ব্যাপারটি হচ্ছে নিজের যোনিতে এমন একটা উত্তেজনাময় অনুভব তৈরি হবে যেটা আগে কখনো অনুভব করেননি। এক রকমের অসহ্য আনন্দ। কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এই অনুভবের পর ভীষণ ক্লান্তি অনুভব করবেন আর যোনির পিচ্ছিল ভাব কমে গিয়ে যোনি শুকিয়ে আসবে। পিপাসা বোধ করতে পারেন, ক্লান্তিতে ঘুম আসবে, হুট করেই যৌন মিলনের আগ্রহ হারিয়ে যাবে, শরীর কাঁপতে পারে আবেশে, যোনির ভেতরে কম্পন অনুভূত হতে পারে। [১]

অর্গাজমিক ডিসওর্ডার
দেশের পৌরসভাগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় গত এক দশকে বিবাহ বিচ্ছেদের হার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। শতকরা প্রায় ৭০ ভাগেরও বেশি তালাক দেওয়া হয়েছে নারীর পক্ষ থেকে। বাকী ২৯ দশমিক ১৫ ভাগ তালাক দিচ্ছেন পুরুষরা। তালাকপ্রাপ্ত নর-নারীরা পরকীয়া সম্পর্ককে বিবাহ বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন।

প্রতিবেদনটি একজন রোগীর কথা মনে করিয়ে দিল যাকে আমরা দেখেছিলাম আজ থেকে তিন বছর আগে সেক্স ক্লিনিকে। বলার অপেক্ষা রাখে না রোগীটি একজন নারী। শিক্ষিত এবং উপার্যনক্ষম। হয়ত সে কারণেই ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিতে তার সময় কম লেগেছিল। তার ছিল অর্গাজমিক ডিসওর্ডার। কিন্তু তিনি এটা বুঝতে পারছিলেন না। তিনি ভেবেছিলেন সমস্যা তার স্বামীর মধ্যে। তাই তিনি তার স্বামীকে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ হওয়ার পরামর্শ এবং সুযোগ দুটোই দিয়েছিল। কিন্তু তার স্বামী ব্যর্থ হওয়াতে ডিভোর্স করে দ্বিতীয় বিয়ে করতে বাধ্য হন।

তার ভুল ভাঙল যখন তিনি দেখলেন দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গেও একই সমস্যা হচ্ছে। তখন তিনি নিজেকেই একবার ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন মনে করলেন। আমরা তাকে তার রোগ সম্পর্কে বুঝিয়ে বললাম এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিলাম। তিনি যখন বুঝতে পারলেন আসলে তিনি নিজেই রোগী তখন এক অপরাধবোধ তাকে পেয়ে বসল। সেজন্যও আমাদের তাকে কাউন্সিলিং করতে হয়েছিল।

আমাদের সামাজিক দৃস্টিভঙ্গীতে যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে পুরুষকে সক্রিয় সঙ্গী হিসাবে দেখা হয় বলে যেকোনো যৌন সমস্যায় পুরুষকেই দায়ী করা হয় আগে। ধরে নেওয়া হয় তার ব্যর্থতার জন্যই সব হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে চিত্র ভিন্নও হতে পারে। যেমনটি হয়েছিল আমাদের ঐ রোগীর ক্ষেত্রে। পুরুষদের মতো নারীদেরও বেশ কয়েকটি যৌন রোগ আছে। সে রোগগুলো সম্পর্কে কম বেশি ধারণা থাকা আমাদের প্রয়োজন। সেরকম কিছু রোগের কথাই তুলে ধরতে যাচ্ছি এ লেখায়।

ফিমেল সেক্সুয়াল ইন্টারেস্ট/আ্যারাউজাল ডিসওর্ডার, ফিমেল অরগাজমিক ডিসওর্ডার, জেনিটো পেলভিক পেইন/পেনিট্রেশন ডিসওর্ডার। নারীর যৌন রোগ মূলত এ কয়টিই। এছাড়াও আছে নেশা সংক্রান্ত যৌন সমস্যা যা নারী পুরুষ উভয়েরই হতে পারে।

আমাদের স্বাভাবিক সামাজিক দৃস্টিভঙ্গীতে দেখা হয় নারী হবে লজ্জাশীলা। তার যৌন চাহিদা থাকবে কম। প্রাচীন শাস্ত্র যে চার শ্রেণিতে নারীকে বিভক্ত করেছে তার মধ্যে একমাত্র হস্তিনী নারীর কামভাব প্রবল। এরকম একটি সামাজিক পরিবেশে ফিমেল সেক্সুয়াল ইন্টারেস্ট/আ্যারাউজাল ডিসওর্ডারের রোগী খুঁজে পাওয়া মুসকিল। কারণ যৌন অনীহাকে অনেকেই সেক্ষেত্রে ইতিবাচক মনে করবে। কিন্তু এই যৌন শীতলতার পরিমাণটা এতো বেশি যে পুরুষ সঙ্গীকে ঝামেলায় পড়তে হয়। আর কোনো সমস্যা যন্ত্রণাদায়ক না হলে আমরা তাকে মানসিক রোগ বলি না।

যিনি এই রোগে ভোগেন, তার যৌন ইচ্ছা বা আকাঙ্খা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে যায় বা বেশিরভাগ সময়ে একদম অনুপস্থিত দেখা যায়। যৌন মিলনে সে কোনো আগ্রহ অনুভব করে না। নিজে থেকে কোনো ধরনের পদক্ষেপও নেয় না। নিজে থেকে পদক্ষেপ নেওয়া বলতে বুঝায় কাছে এগিয়ে আসা ,স্পর্শ করা, ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হওয়া বা ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। তবে দাম্পত্য সম্পর্কের অবনতি হলেও এমনটা হতে পারে। সেক্ষেত্রে সেটা রোগ নয়।

নারীর যৌন শীতলতাকে রোগ আমরা তখন বলব যখন ৬ মাস বা তারও অধিক সময় ধরে-
১. যৌন কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহ থাকবে না বা কমে যাবে
২. যৌন উত্তেজক চিন্তা বা কল্পনা থাকবে না বা কমে যাবে
৩. যৌন কর্মকাণ্ডে নিজে থেকে কোনো পদক্ষেপ নেবে না আবার সঙ্গীর পদক্ষেপেও সাড়া দেবে না
৪. বেশিরভাগ যৌন মিলনে নিরুত্তাপ, নিস্তেজ, নিস্পৃহ থাকবে
৫. বাহ্যিক বা আভ্যন্তরীণ যৌন উদ্দিপনা বা ইঙ্গিতের প্রতি অনীহা দেখা যাবে
৬. মিলন কালিন সময়ে শারীরিক বা যৌন স্পর্শে শিহরিত কম হবে বা হবে না

কোনো কোনো নারীর মধ্যে সক্রিয় যৌন জীবনের ( আ্যাকটিভ সেক্সুয়াল লাইফ) শুরু থেকেই এ ধরনের সমস্যা দেখা যায়। কারো কারো ক্ষেত্রে স্বভাবিক যৌন জীবনের পর এরকমটা দেখা দেয়। প্রথমটাকে বলা হয় লাইফ লং বা আজীবন আর দ্বিতীয়টাকে বলা হয় আ্যাকোয়ার্ড বা অর্জিত।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

এই বিভাগের আরো খবর
মন্তব্য
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: