ভ্যাকসিন নিয়ে ট্রল নয়, ওরস্যালাইন আবিষ্কার করে পাঁচ কোটি প্রাণ বাঁচিয়েছিল বাংলাদেশ

করোনাভাইরাস প্রতিরোধী ভ্যাকসিন আবিষ্কারের তালিকায় নাম উঠলো বাংলাদেশের। জুলাইয়ের শুরুতেই আনুষ্ঠানিকভাবে দেশে প্রথমবারের মতো করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড। বিষয়টি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু কিছু মানুষ বিষয়টি নিয়ে ঠাট্টা বা ট্রল করছেন! অথচ অনেকেই জানেন না, ওরস্যালাইন আবিষ্কার করে পাঁচ কোটি প্রাণ বাঁচিয়েছিল বাংলাদেশ! এখনো এই স্যালাইন খেয়ে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু নতুন জীবন পাচ্ছে।

বিংশ শতাব্দীর সেরা আবিষ্কার

বিখ্যাত জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট ১৯৭৮ সালের ৫ আগস্ট সম্পাদকীয়তে বলেছিল, ওআরএসের আবিষ্কার চিকিৎসার ক্ষেত্রে শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ওআরএস তীব্র ডায়রিয়া চিকিৎসায় তরল খাওয়ানোর রাস্তা খুলে দিয়েছে।

জীবন রক্ষাকারী নতুন চিকিৎসাপ্রযুক্তি বা পদ্ধতি সাধারণত জটিল হয়। শুরুতে নতুন ওষুধ বা চিকিৎসাযন্ত্র ব্যয়বহুল হয় এবং অনেকের নাগালের বাইরে থাকে। ব্যতিক্রম ওআরএস। ওআরএস বা ওরাল রিহাইড্রেসান সলিউশন এখন বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারে পরিচিত একটি পণ্য। বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন, কোনো পরিবার খাওয়ার স্যালাইন তৈরি করতে জানলে বা কোনো পরিবারে স্যালাইনের প্যাকেট মজুত থাকলে ওই পরিবারের কোনো সদস্য ডায়রিয়ায় মারা যাবে না।

স্যালাইন আবিষ্কারের গল্প

ওআরএস নিয়ে গবেষণা, আবিষ্কার, মানুষের কাছে পৌঁছানোর কৌশল, মানুষকে ওআরএস বানাতে শেখানো—এর সব হয়েছে বাংলাদেশে। মূল গবেষণা করেছেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানীরা। আর সেই আবিষ্কারের নেপথ্যে ছিলেন বাংলাদেশি চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলাম। তার সঙ্গে ছিলেন বিজ্ঞানী ডেভিড আর নেলিন ও রিচার্ড এ ক্যাস। ওই গবেষণার ফলাফল ১৯৬৮ সালের আগস্টে ল্যানসেট–এ প্রকাশিত হয়।

তবে মূল গল্পটা শুরু হয় ১৯৭১ সালে। স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে উত্তাল বাংলাদেশ। রাজপথ তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দখলে। আর সেই যুদ্ধের পরিস্থিতিতে কাতারে কাতারে ভিটেমাটি ছেড়ে চলে আসছেন মানুষ। কেউ কেউ কাঁটাতার পেরিয়ে চলে আসছেন ভারতবর্ষে। সীমান্ত অঞ্চল জুড়ে গড়ে উঠছে উদ্বাস্তুশিবির। নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কোনোরকমে বেঁচে থাকতে হচ্ছে তাদের

স্বাভাবিকভাবেই, যুদ্ধের দোসর হয়ে হাজির মহামারীও। কলেরা আর ডায়রিয়ায় প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। ডায়রিয়ার চিকিৎসা বলতে তখনও শুধু ইন্ট্রাভেনাস স্যালাইন। অথচ মহামারীর প্রাদুর্ভাব যত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, স্যালাইনের জোগান সেই তুলনায় খুবই কম। আর এর মধ্যেই ডা. রফিকুল ইসলাম মুমূর্ষু মানুষদের বাঁচাতে বেছে নিলেন একটি ঘরোয়া পদ্ধতি। একগ্লাস জলে খানিকটা গুড় আর একচিমটে লবণ মিশিয়ে খাইয়ে দিলেন রোগীদের। শরীর থেকে ক্রমাগত তরল পদার্থ বেরিয়ে যাওয়ায় যাদের অবস্থা প্রায় মরণাপন্ন হয়ে উঠেছিল, তারা সেরে উঠতে থাকলেন।

এই সময়েই শরীরী বিজ্ঞানের দীর্ঘদিনের একটা অমীমাংসিত রহস্য পরিষ্কার হয়ে আসে। পিএসসিআরএল এর পরীক্ষাগারেই তৈরি হয় প্রথম পরিমিত ওরাল স্যালাইন বা ওরস্যালাইন। সারাবিশ্বে কলেরা ও ডাইরিয়ার চিকিৎসায় ব্যাপক ব্যবহৃত হয় এই দ্রবণ। এমনকি ডিহাইড্রেশনের প্রাথমিক চিকিৎসা হিসাবে ওরাল স্যালাইনের ব্যবহার সর্বত্র স্বীকৃত। ১৯৮০ সালে এই আবিষ্কারকে স্বীকৃতি দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও।

পাঁচ কোটি শিশুর জীবন বাঁচিয়েছে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিশ্বব্যাপী পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ ডায়রিয়া। প্রতিবছর ৫ লাখ ২৫ হাজার শিশুর এতে মৃত্যু হচ্ছে। কারণ ডায়রিয়া হলে পায়খানার সঙ্গে পানি দ্রুত বের হয়ে যায়। ওআরএস সেই পানি প্রতিস্থাপন করে। এটি এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কোটি শিশুর জীবন বাঁচিয়েছে।

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, সবখানে খাওয়ার স্যালাইনের প্যাকেট পাওয়া যায়। ছোট মুদি বা ওষুধের দোকানেও বিক্রি হয়। কিনতে ব্যবস্থাপত্র লাগে না। বাংলাদেশের মানুষ চিকিৎসকের পরামর্শেরও প্রয়োজন বোধ করছে না। শুধু বাংলাদেশই নয়, সারা বিশ্বেই এই পদ্ধতি খুবই জনপ্রিয়। এক চিমটি লবণ, এক মুঠ গুড় ও আধা সের পানি, স্যালাইন তৈরিতে এই ফর্মুলার সাফল্য নিয়ে টাইম সাময়িকী ২০০৬ সালের ১৬ অক্টোবর প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছাপে।

একজন রফিকুল

১৯৩৬ সালে কুমিল্লার চৌগ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ডা. রফিকুল ইসলাম। চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক স্তরের পড়াশুনো ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে। ১৯৬৫ সালে ট্রপিক্যাল মেডিসিন ও হাইজিন বিষয়ে স্নাতকোত্তর শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে চলে যান ব্রিটেনে। দেশে ফেরেন যখন, তখন মুক্তিযুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠেছে। গবেষণার পাশাপাশি চলে স্বাধীনতা আন্দোলনের কাজ।

স্বাধীনতার পর বন্ধ হয়ে যায় তার গবেষণার সংস্থা পিএসসিআরএল। কিছুদিনের মধ্যেই নতুন নামে গড়ে ওঠে ইন্টারন্যাশানাল সেন্টার ফর ডাইরিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ। ২০০০ সাল পর্যন্ত এই সংস্থাতেই কাজ করে গিয়েছেন তিনি। তার গবেষণার সূত্র ধরেই সুস্থ হয়ে উঠেছেন অসংখ্য মানুষ। অবশ্য শেষ বয়সে তাকেও কম রোগভোগের শিকার হতে হয়নি। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ‘বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার’-এর পথিকৃৎ।

করোনা ভ্যাকসিন প্রসঙ্গে

গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের রিসার্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের প্রধান ডা. আসিফ মাহমুদ জানান, এনসিবিআই ভাইরাস ডাটাবেজ অনুযায়ী গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ৫ হাজার ৭৪৩টি সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স জমা হয়েছে। যার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে জমা হয়েছে ৭৬টি। উক্ত সকল সিকোয়েন্স বায়োইনফরম্যাটিক্স টুলের মাধ্যমে পরীক্ষা করে গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড তাদের টিকা-র টার্গেট নিশ্চিত করে। যা যৌক্তিকভাবে এই ভৌগোলিক অঞ্চলে অধিকতর কার্যকরী হবে বলে আশা করছেন তারা।

বাংলাদেশের কল্যাণেই তো স্যালাইন খেয়ে কোটি কোটি মানুষ বেঁচে গিয়েছিল। হয়তো আরেকবার কোটি কোটি মানুষ নতুন জীবন পাবে বাংলাদেশের ভ্যাকসিনেই।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

এই বিভাগের আরো খবর
মন্তব্য
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: