বিল গেটস কিংবা জাকারবার্গ হতে পারতেন ফাহিম, হলেন লাশ

তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে যেন তারুণ্যের গাঁটছড়া বাঁধা। বিল গেটস থেকে মার্ক জাকারবার্গ প্রযুক্তির দুনিয়া কাঁপিয়েছেন তরুণ বয়সেই। তরুণ বা নওজোয়ানদের অসাধ্য কিছু নেই। প্রথা ভাঙায় দুঃসাহস দেখাতে পারে শুধু তরুণরাই। বাংলাদেশের ফাহিম সালেহ এমনই এক তরুণ ছিলেন, যিনি বিল গেটস, মার্ক জাকারবার্গ বা ইলন মাস্ক হতে পারতেন। হতে পারতেন বিশ্বের কোটি তরুণপ্রাণের আইডল। হওয়ার পথেই তো হয়ে গেলেন লাশ!

মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ৩টার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের নিজস্ব অ্যাপার্টমন্ট থেকে পাঠাওয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ফাহিম সালেহ’র খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার খণ্ডিত দেহের পাশে একটি বৈদ্যুতিক করাত পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি দিয়েই ফাহিমের মাথা, দুই হাত, দুই পা কেটে শরীর থেকে আলাদা করা হয়। কী নৃশংস! মানুষ কতটা ক্রূর, নিষ্ঠুর কিংবা হিংস্র—ভাবা যায়?

‘মারা যাওয়ার পর মানুষ জনপ্রিয় হয়’—এমন কথা প্রচলিত আছে আমাদের সমাজে। কারণ আমরা নিয়মিত পাঠাওয়ে চড়লেও, খবর রাখি না কে এই সেবার নেপথ্যে রয়েছেন। ফাহিমও প্রকাশ্যে আসতেন না ঘটা করে, কারণ আড়ালে থেকেই কাজ করতে পছন্দ করতেন তিনি। পাঠাওয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা তিনি, পরে নিজের অংশের শেয়ার বিক্রি করে পৃষ্ঠপোষক পদে ছিলেন। জোবাইক, যাত্রীসহ আরো কিছু দারুণ প্রজেক্টে তিনি ছিলেন বিনিয়োগকারী। এর বাইরে নাইজেরিয়াতে গোকাডা এবং কলাম্বিয়াতে পিকঅ্যাপ নামে আরো দুটি রাইড শেয়ারিং কোম্পানি শুরু করেছিলেন, ভালো মুনাফাও অর্জন করেছিলেন সেখান থেকে।

১৮ বছরে কোটিপতি

১৯৮৬ সালে জন্ম ফাহিমের। তার বাবা সালেহ উদ্দিন বড় হয়েছেন চট্টগ্রামে আর মা নোয়াখালীর মানুষ। তবে ফাহিম থাকতেন নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি টিনেজারদের জন্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক বানিয়েছিলেন, নাম টিন-হ্যাংআউট ডটকম। শুরুর দুই বছরের মাথায় বছরে বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় দেড় কোটি টাকা আয় হয় এই সাইট থেকে। আঠারো বছর বয়সেই কোটিপতি হয়ে গিয়েছিলেন ফাহিম!

এছাড়া মেধাবি ছাত্র ফাহিম নিউইয়র্কের একটি হাই স্কুলে পড়াকালীন সময়েই ‘উইজ টিন’ নামক একটি ওয়েবসাইট তৈরি করে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিলেন। বেশ অর্থও আয় করতে সক্ষম হন। এরপর ম্যাসেচুসেটস স্টেটের বেন্টলি ইউনিভার্সিটি থেকে বিশেষ কৃতিত্বের সঙ্গে কম্পিউটার ইনফরমেশন সিস্টেমে ব্যাচেলর করেন ফাহিম।

উদ্ভাবনী মেধাসম্পন্ন ফাহিম আর পেছনে ফিরে না তাকিয়ে কিংবা কোন কোম্পানীতে চাকরির চেষ্টা না করেই মা-বাবার জন্মস্থান বাংলাদেশে ছুটেন। ২০০৭ সালে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে মিলে ফাহিম ঢাকায় হ্যাকহাউস নামের একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। সেটা খুব একটা সফলতা পায়নি। ফের ফিরে যান আমেরিকায়। তবে ২০১৪ সালে নিউইয়র্ক থেকে ঢাকায় গিয়ে পাঠাও চালু করে নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন তিনি।

রেখে গেছেন পাঠাও

তিনজন তরুণের হাত ধরে ঢাকার রাজপথে পাঠও। তাদের মধ্যে একজন ফাহিম সালেহ। তবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকায় খুব বেশি মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন না। ২০১৫ সালে যখন বাইক রাইড শেয়ারিং নিয়ে কারো তেমন কোনো ধারণাই ছিল না, তখন মাত্র ১০০টি বাইক নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল পাঠাও।

সেই পাঠাও এখন দেশের সবচেয়ে বড় রাইড শেয়ারিং কোম্পানী, প্রায় ১ লাখ রাইডার কাজ করেন পাঠাওয়ে, প্রায় চার হাজার কোটি টাকা এই কোম্পানি মূল্যমান, শত শত কোটি ইনভেস্টমেন্ট। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, পাঠাওয়ের আগমনের কারণে অজস্র মানুষ অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হয়েছে। বেকার যুবকরা রাউড শেয়ারিংয়ে নাম লিখিয়েছে, মোটর সাইকেলের বিক্রি বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।

ঝুঁকি নিতে ভয় পেতেন না

ফাহিম কখনো ঝুঁকি নিতে ভয় পেতেন না। তাই তো নাইজেরিয়া থেকে নেপাল বা কলম্বিয়া- ছুটে গেছেন সব জায়গায়। নতুন কোন উদ্যোগ তার পছন্দ হলে সেটার পাশে দাঁড়াতেন সাধ্যমতো। অল্প বয়সে দারুণ খ্যাতির দেখা পেয়েছেন, কিন্ত অহংকার তাকে গ্রাস করতে পারেনি।

ফাহিম সালেহ বিল গেটস, মার্ক জাকারবার্গ বা ইলন মাস্ক হতে পারতেন। কিন্ত তিনি হয়ে গেলেন লাশ। বাংলাদেশ তার এক রত্নকে হারালো, এমন মেধাবী উদ্যোক্তা যত্রতত্র পাওয়া যায় না। ফাহিমের মতো কাউকে পেতে হলে বাংলাদেশকে কত বছর অপেক্ষা করতে হবে, তা কারোই জানা নেই।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

এই বিভাগের আরো খবর
মন্তব্য
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: