পেট তো মান-ম’র্যাদা বোঝেনা! বাধ্য হয়েই টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়েছি…

পেট তো আর মান-ম’র্যাদার ধার ধারেনা! লজ্জা-শরমের কথা কি আর বলবো ভাই? এমনিতেই মাসের শেষ সময়। লজ্জা শরমের দিকে তাকিয়ে থাকলে ঘরে চুলা নাও জ্বলতে পারে! বউ-বাচ্চাকেও তো সেটি বোঝাতে পারবো না! তাই একরকম বাধ্য হয়েই টিসিবির লাইনে দাড়িয়েছি।

‘সাংবাদিক পরিচয়ে তার এমন দীর্ঘশ্বা’সের কারন কি’, এমন প্রশ্নের উত্তরে এভাবেই নিজের আক্ষেপের কথা জানাচ্ছিলেন কম দামে টিসিবির পণ্য কিনতে এসে রাজধানীর মিরপুরের একটি সড়কে টিসিবির ট্রাকের পেছনে দীর্ঘ সারিতে দাড়িয়ে থাকা তৌকির আহমেদ নামে এক ব্যাক্তি।

তৌকির আহমেদ জানান, রাজধানীর মিরপুরে তিন ছে’লেমে’য়ে, স্ত্রী’ ও মাকে নিয়ে একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে থাকেন তিনি। চাকরি করেন মতিঝিলের একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে। মাসিক বেতনও মোটামুটি সম্মানজনক হলেও প্রতিদিন অফিসে যাতায়াত খরচ,বাসাভাড়া, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ,সংসার খরচ বাবদ যা ব্যয় হয় তাতে মাসের শেষে হাতে কিছুই অবশিষ্ট থাকেনা। মাঝে মধ্যে পরিবারের কারো অ’সুখ বিসুখ কিংবা বিশেষ বাড়তি ব্যয় হলে সেই মাস সংসার চালাতে হয় একরকম টানাটানি করে।

দেশের বাজারে চাল, তেল, ডাল, চিনি,কাঁচাবাজারসহ নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছেই। কম মূল্যে টিসিবি’র পণ্য কিনতে পারলে সংসারে একটু স্বস্তি মিলবে। সেই আশাতেই একরকম বাধ্য হয়েই এই লাইনে দাড়িয়েছি।

তিনি আফসোস করে আরো বলেন,গতকালও দাড়িয়েছিলাম কিন্ত চাহিদার তুলনায় ট্রাকে পণ্যের বরাদ্দ কম থাকায় খালি হাতে ফিরতে হয়েছিলো। চক্ষুলজ্জা পায়ে ঠেলে একটু কম দামে টিসিবির পণ্য কিনতে এসে আজও এমন দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে নিজেকে খুবই অসহায় একজন মানুষ মনে হচ্ছে!

সোমবার (২৮) ফেব্রুয়ারী রাজধানীর মিরপুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে। দেখা গেলো, করো’নার ভ’য় উপেক্ষা করে টিসিবির পণ্য বন্টনকারী একটি ট্রাকের পেছনে দীর্ঘ সারিতে গাদাগাদি করে দাড়িয়ে আছেন কয়েক শতাধিক মানুষ। তবে নিন্ম আয়ের মানুষের সাথে সাথে লাইনে মধ্যবিত্তদের সংখ্যাও রয়েছে চোখে পড়ার মতো।

এসময় সাবরিনা আক্তার নামে এক নারী জানালেন,কয়েক ঘন্টা দাড়িয়ে থাকার পর ৬৫ টাকা দরে ২ কেজি চিনি এবং ১১০ টাকা দরে ২ লিটার সয়াবিন তেল কিনেছি। আরো কিছু দরকার ছিলো কিন্ত পেলাম না।

আব্দুল আওয়াল নামে আরো এক ব্যাক্তি বলেন, এখানে ট্রাক পৌঁছানোর আগেই এসে অ’পেক্ষা করছিলাম। দীর্ঘসময় দাড়িয়ে থেকে ৫৫ টাকা দরে ২ কেজি মসুর ডাল,কয়েক কেজি পেয়াজ পেলাম। আর কিছু পাবো বলে আশা নাই।

ইয়ার আলী নামে অ’পর একজন বললেন,আজকে শুধু ডাল আর তেল নিয়েই ফিরে যাচ্ছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও আমা’র মতো হয়তো সবার ভাগ্যে জুটবে না।

বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে ট্রাকে টিসিবির পণ্য বন্টনকারী ব্যাক্তি জানালেন,তার ট্রাকের জন্য বরাদ্দ মাত্র ৬শ’ লিটার সয়াবিন তেল, ৫শ’ কেজি চিনি ও ৪শ’ কেজি মসুর ডাল। অ’পরদিকে লাইনে দাড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষ। সবাইকে দিতে পারবো কিনা স’ন্দেহ আছে। আমাদের যা বরাদ্দ দেয় আম’রা তাই বন্টন করি। এর বাইরে আমাদের কোনো ক্ষমতা নেই।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জাঁতাকলে প্রতিনিয়ত পিষ্ট হয়ে কম দামে পণ্য কিনতে আসা এসব মানুষের দাবি, ২ লিটারের পরিবর্তে ৫ লিটার তেল এবং ট্রাক আর পণ্যের সংখ্যা ও পরিমাণ বাড়ানো উচিত টিসিবির।

এবিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী এ্যাডভোকেট ফিরোজ আলী মন্ডল বলেন,বর্তমান প্রেক্ষাপটে টিসিবির কার্যক্রম সীমিত। সামনে আসছে রমজান মাস। সেসময় সরকার যদি টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে ভোক্তাদের হাতে পণ্য পৌছে দিতে পারে তাহলে নাগরিকদের স্বস্তি মিলবে। টিসিবির কার্যক্রম আরো বৃদ্ধি করে শুধু শহর কেন্দ্রীকই নয়;বরং শহর, উপশহর এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এই কার্যক্রম বৃদ্ধি সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জল করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.