নাচ-গান-ঝাড়-ফুঁক দিয়ে প্যারালাইসিস রোগীর চিকিৎসা!

নাচ-গান-ঝাড়-ফুঁক দিয়ে প্যারালাইসিস রোগীর চিকিৎসা!

চারপাশ বাঁশ দিয়ে ঘেড়া। চারকোনায় ৪টি কলাগাছ। উপরে ছামিয়ানা টানানো। ভিতরের অংশ ১০ বর্গফুট হবে। ছামিয়ানার নিচে সত্তরউর্দ্ধ এক বৃদ্ধা। তিনি মাঝামাঝি বসা। পাশে ঝাড়ু হাতে এক কবিরাজ। তিনি নেচে নেচে গান গাইছেন। নাচ গানের তালে বৃদ্ধার চারদিকে ঘুরছেন।

তারপর বৃদ্ধাকে ঝাড়ু দিয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছেন মাথা থেকে পা পর্যন্ত। আবার নাচ গান করে ঘুরছেন। তার সঙ্গে ঘুরছেন কয়েকজন কিশোরী। তাদের পরনে হলুদ শাড়ি। তারাও কবিরাজের সঙ্গে সুর মিলিয়ে নাচ গান করছেন। কিশোরীরাও বৃদ্ধার মুখমন্ডল মুছে দিচ্ছেন তাদের শাড়ির আঁচল দিয়ে। পাড়াপরশিরা তা উপভোগ করছেন। এভাবে নিজের

বাড়ির আঙ্গিনায় অপচিকিৎসা দিয়ে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন কবিরাজ ফুল মিয়া (৫০)।গাইবান্ধা সদর উপজেলার বোয়ালি ইউনিয়নের নশরতপুর গ্রামে তার বাড়ি । রবিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নশরতপুর গ্রামে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা গেছে।

এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ফুল মিয়ার তেমন লেখাপড়া নেই। একসময় তিনি গাইবান্ধা শহরে কুলির কাজ করতেন। এরপর দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে তিনি নিজ বাড়িতে কবিরাজি করছেন। বিশেষত তিনি প্যারাইসিস রোগীর চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। প্রতি রোগীকে ৩০ থেকে ৫০ মিনিট ঝাড় ফুঁক দেন। এরজন্য একজন রোগীর কাছ থেকে ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা ফি নেন। ঝাড়-ফুঁকের সময় তার সঙ্গে পাঁচ-ছয়জন কিশোরী কাজ করেন। তারা সবাই ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণির ছাত্রী। তাদেরকেও কিছু সম্মানি দেন কবিরাজ।

এ পর্যন্ত কতজন রোগীর চিকিৎসা দিয়েছেন। তার কোনো হিসেব কবিরাজের কাছে নেই। কুসংস্কারকে বিশ্বাস করে দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা এখানে আসছেন। তারা সুস্থ হন কি না এলাকাবাসী জানেন না।

তবে কবিরাজ ফুল মিয়া দাবি করেন তার কাছে আসা সব রোগীই সুস্থ হন। কিন্তু প্যারালাইসিস রোগে আক্রান্ত হবার ১০-১৫ দিনের মধ্যে তার কাছে আসতে হবে। সেসব রোগীকে তিনি গ্যারান্টি দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। তার মতে, ঝাড়-ফুঁক করতে অনেক সময় লাগে। এসময় রোগীরা বিরক্ত হন। ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলেন। তাই বিনোদনের মাধ্যমে ঝাড়-ফুঁক করা হয়। ঝাড়ুর ব্যবহারের কারণ কি, জানতে চাইলে কবিরাজ বলেন, ঝাড়ুটি বন (দোয়া তাবিজ) করা। এটি রোগীর শরীরে ছুঁয়ে দিলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে।

নশরতপুর গ্রামের স্কুলশিক্ষক আবদুস সোবহান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কবিরাজ ফুল মিয়া এভাবে অপচিকিৎসা দিচ্ছেন। তার খপ্পরে পড়ে নিরীহ মানুষ প্রতারিত হচ্ছেন। প্যারালাইসিস রোগ তো ভালই হচ্ছে না। বরং তারা টাকা পয়সা নষ্ট করছেন।

গাইবান্ধার সিভিল সার্জন আ.ক.ম. আখতারুজ্জামান বলেন, গ্রামাঞ্চলে এসব কুসংস্কার এখনো আছে বলে শোনা যায়। এ ধরনের অপচিকিৎসার কোনো ভিত্তি নেই। এটা সম্পন্ন কুসংস্কার এবং প্রতারণা। রোগব্যাধি ভালো হবার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। যেকোন রোগই হোক সেজন্য হাসপাতাল রয়েছে।তিনি আরও বলেন, ঝাড়-ফুঁকে তেমন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না হলেও রোগী মানষিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হন। তবে এসব কবিরাজের কাছ থেকে ওষুধ জাতীয় কিছু সেবন করলে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। এদের কাছ থেকে বিরত থাকাই ভালো।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *