টাকার জন্য অধ্যক্ষের লাশ ৬ টুকরা করলো তারই তিন বন্ধু

টাকার জন্য অধ্যক্ষের লাশ ৬ টুকরা করলো তারই তিন বন্ধু

সাভার রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষের সাথে পেশাগত হিংসা ও প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ নিয়ে লেনদেন নিয়ে মনমালিন্যের জেরে অধ্যক্ষ মিন্টুকে হত্যা করে লাশ ৬ টুকরো করে তারই বন্ধু রবিউল ও সহযোগী বাদশা। এঘটনায় মুল পরিকল্পনাকারী মোতালেবসহ তিন জনকেই গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। ঘটনার পর হত্যাকারীরা নিজেই মিন্টুকে খুঁজে বেড়ান। স্থানীয়দের কাছে তারা এমনভাবে ঘুরে বেড়ান অধ্যক্ষকে হারিয়ে তার খুবই মর্মাহত। এদিকে মোতালেব নিজেই মিন্টুর ভাইকে ফোন করে জানান মিন্টুকে পাওয়া যাচ্ছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মিন্টু চন্দ্র বর্মন আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় ২০১৯ সালের আগে একটি স্কুলে শিক্ষক হিসাবে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে ২০১৯ সালে দুই বন্ধু মোতালেব ও রবিউলকে সাথে নিয়ে আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকার রুপায়ন স্বপ্ন নিবাস আবাসনে সাভার রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। তারা লকডাউনের মধ্যেও নিয়মিত কোচিং চালু রেখেছেন। মিন্টু স্কুলে বেশি শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতেন। শিক্ষার্থীরা শুধু মিন্টুর কাছেই কোচিং করতে চাইতেন। এতে করে মিন্টুর ভাল টাকা আয় হতো। রবিউল ও মোতালেব বেশি শিক্ষার্থী পেতো না। ফলে তাদের কম টাকা আয় হতো।

এ থেকে তাদের হিংসা হতে থাকে। এরই জেরে গত ৭ জুলাই রবিউল, মোতালেব ও বাদশা মিন্টুকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ১৩ জুলাই মিন্টুকে প্রতিষ্ঠানটির ১০৬ নম্বর শ্রেণিকক্ষে ডেকে নিয়ে যায় তারা। পরে মিন্টুর মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে বাদশা। এসময় মিন্টু মাটিতে পড়ে গেলে তাকে জবাই করে হত্যার পর মাথা, হাত দা দিয়ে কুপিয়ে ও পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে তারা।

এর পর মাথা রাজধানীর আশকোনার একটি ডোবায় ফেলে দিয়ে স্কুলটির আঙ্গিনায় মিন্টুর দেহের ৫ অংশ পুতে রাখেন। এর পর ঘটনার ৭ দিন পর মিন্টুর ভাই দীপককে ফোন করে মোতালেব জানায় তার ভাইকে পাওয়া যাচ্ছে না। পরে ২২ জুলাই আশুলিয়া থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেন মিন্টুর ভাই দীপক। গতকাল রাতে হত্যাকারিদের গ্রেফতার করে আজ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, থানায় সাধারন ডায়েরি হওয়ার পর এই স্কুলের সামনে অনেকবার থানার উপ-পরিদর্শক মিলন ফকির এসেছিলেন।

এসময় স্কুলটির বাকি দুই অংশীদার মোতালেব ও রবিউলের সাথে কথা বলেন পুলিশ কমকর্তা। মোতালেব ও রবিউল অনেক দুঃখ প্রকাশ করেন। তারা খুবই মর্মাহত বলে ওই পুলিশ অফিসারকে জানায়। পরে পুলিশ অফিসারের সাথে তারা বিভিন্ন স্থানে খুঁজে বেড়ান। স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান এতোদিন এমন লোকজনের সাথে ছিলাম ভাবতেই গায়ে কাটা দিচ্ছে। গ্রেফতারকৃত হলেন, (১) মোঃ রবিউল ইসলাম (৩০), পিতা-জালাল উদ্দিন, গ্রাম+পোষ্ট-চন্ডিপুর, থানা-সুন্দরগঞ্জ, জেলা-গাইবান্ধা, (২) মোঃ আবু মোতালেব (৩০), পিতা-মোঃ মফিজুর রহমান, গ্রাম-গিতালগঞ্জ, পোষ্ট-ভজনপুর, থানা-তেতুলিয়া, জেলা-পঞ্চগড় ও (৩) মোঃ আঃ রহিম বাদশা (২২), পিতা-মোঃ আব্দুল ওহাব, গ্রাম+পোষ্ট-চন্ডিপুর, থানা-সুন্দরগঞ্জ, জেলা-গাইবান্ধা’কে যথাক্রমে ঢাকার আব্দুল্লাহপুর ও আশুলিয়া (সাভার) এবং গাইবান্ধা হতে গ্রেফতার করে। আশুলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক মিলন ফকির বলেন, আমি বেশ কয়েকদিন ঘটনাস্থলে এসেছিলাম।

এসময় মোতালেব ও রবিউলের সাথে একাধিকবার কথা বলেছি। তারা খুবই মর্মাহত বলে প্রকাশ করেছেন। তবে তাদের কথা বার্তা ও চলাফেরায় সন্দেহ হলে তাদের নজরদারিতে রাখা হয়। পরে গতকাল র‌্যাব তাদের গ্রেফতার করে আজ মরদেহের খন্ডিতাংশ উদ্ধার করেন। এব্যাপারে নিহতের চাচাত ভাই কালিশঙ্কর চন্দ্র বলেন, গত ১৯ জুলাই মোতালেব ফোন করে আমাদের বলেন, আমাদের ভাই মিন্টু চন্দ্র বর্মনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পরে আমরা ২২ জুলাই আশুলিয়া থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করি। আজ শুনি মোতালেবরাই আমার ভাইকে হত্যা করেছে। আমি হত্যাকারীদের শাস্তি দাবি করছি।

স্কুলটির কেয়ারটেকার ও একই স্কুলের ৮ম শ্রেণীর ছাত্র শুভ বলেন, মিন্টু স্যার স্কুলের অধ্যক্ষ, মোতালেব স্যার পরিচালক ও রবিউল স্যার সহকারি শিক্ষক ছিলেন। মিন্টু স্যার হিন্দু হলেও তিনি ইসলাম শিক্ষা ক্লাস নিতেন। যেদিন থেকে স্যার নিখোঁজ হয়, সেদিন থেকেই মোতালেব ও রবিউল স্যার মিন্টু স্যারকে খুঁঝে বেড়ান। মাঝে মধ্যে রবিউল স্যার এখান থেকে অন্য জায়গায় গিয়ে থাকেন। নিখোঁজ মিন্টু চন্দ্র বর্মন লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার টংভাঙ্গা ইউনিয়নের বাড়াইপাড়া গ্রামের শর্ত বর্মনের ছেলে।

তিনি অনেক মেধাবী ও সহজ সরল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। র‌্যাব সদর দফতরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রথমে ৭ জুলাই মিন্টুকে হত্যার পরিকল্পনা করে। পরে ১৩ জুলাই স্কুলটিতে কোচিং পরবর্তী সময়ে ১০৬ নম্বরে মিন্টুকে ডেকে নিয়ে যায় বাদশা ও মোতালেব। এসময় মিন্টুর মাথায় হাতুড়ি দিয়ে বাদশা আঘাত করে। রবিউল ও বাদশা ধারালো দা দিয়ে ৬ টুকরো করে মাথা রাজধানীর আশকোনার একটি ডোবায় ফেলে দেয়। বাকি ৫ টুকরো স্কুলের আঙ্গিনায় পুতে রাখে তারা।

তিনি আরও বলেন, মিন্টু বর্মণের সুনাম ও খুব ভাল শিক্ষক হওয়ায় অনেক বেশি শিক্ষার্থী কোচিং করতে আসতো। ওতে মোতালেব ও রবিউলের আয়ে ভাটা পড়তো। এ থেকে হিংসা শুরু করেন গ্রেফতাররা। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ নিয়েও তাদের মধ্যে মনমালিন্য ছিল। এর জের ধরেই তাকে হত্যা করে তারা। এর পর থেকেই রবিউল পলাতক ছিল। গত মধ্যরাতে রবিউলকে আব্দুল্লাপুর থেকে, তার ভাগিনা বাদশাকে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থেকে আর মোতালেব কে আশকোনা থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরে রবিউলের দেওয়া তথ্যমতে স্কুলের আঙ্গিনা থেকে মিন্টুর শরীরের ৫ টি খন্ডিতাংশ উদ্ধার করা হয় ও রাজধানীর আশকোনা থেকে বিকেলে মিন্টুর মাথা উদ্ধার করা হয়।

শেয়ার করুন