এমপি নিক্সনের হুমকির জবাবে মন্ত্রিপরিষদে ডিসির চিঠি

প্রকাশ্য সভায় জেলা প্রশাসক অতুল সরকারকে নিয়ে ফরিদপুর-৪ আসনের স্বতন্ত্র এমপি মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সনের বক্তৃতায় গোটা জেলাজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। নিক্সন চৌধুরীর ভিডিও এবং অডিও ভাইরাল হয়েছে। এদিকে ১১ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে লেখা চিঠিতে সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।

জানা গেছে, গত শনিবার ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার চেয়ারম্যান পদে উপনির্বাচনে নিক্সন চৌধুরীর সমর্থিত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হাফেজ মো. কাউসার বিজয়ী হন। তিনি এর আগে ছিলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সমর্থক। নির্বাচন শেষে চরভদ্রাসন উপজেলা আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে সমাবেশে ফরিদপুর-৪ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন অভিযোগ করেন, ‘জেলা প্রশাসক অতুল সরকার ১২ জন ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। অনেককেই গ্রেফতার করিয়েছে।’ তিনি জেলা প্রশাসক অতুল সরকারকে ‘রাজাকার’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘রাজাকার না হলে মাত্র চারটি ইউনিয়নে ১২ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়েছেন কেন? সেই ম্যাজিস্ট্রেটরা যেখানে আমার নেতা-কর্মীদের পেয়েছে সেখানেই হামলা করেছে। আমার কর্মীরা ভেঙে পড়েছিল, কিন্তু আমি বলেছি, আপনারা ভয় পাবেন না। আমি বলেছি, উনি তো কেবল জেলা প্রশাসক, ওনার চেয়ে বড় বড় প্লেয়ার আমি দেখে এসেছি। ওইসব সরকারি গুন্ডাদের থেকে আমাদের নেতা-কর্মীরা জান বাজি রাইখ্যা তাদের প্রতিহত কইর‌্যা জনগণ নৌকাকে ১১ হাজার ভোটে বিজয়ী করছে।’ এমপি নিক্সন বলেন, ‘অনেকেই বলে নৌকা প্রতীক পাইলেই নাকি বিজয়ী হয়, এইবার নৌকা পাইয়া আমি ঠেলাডা বুঝছি।’ নিক্সন চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন, ‘জেলা প্রশাসক ১২ জন ম্যাজিস্ট্রেট দিয়া নৌকাকে হারাইয়া বিএনপির প্রার্থীকে জিতানোর জন্য ষড়যন্ত্র করছে।’ নিক্সন চৌধুরী হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘আমি জেলা প্রশাসককে সাবধান করে বলব, আপনি ফরিদপুরেই দেখছেন অনেক বড় নেতার পতন হয়ে গেছে। ফরিদপুরের অনেক নেতা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, সেই নেতাদের বিচার হলে জেলা প্রশাসকেরও বিচার হবে। কারণ বালুর ব্যবসার ভাগ সবই পাইছে। আমি জেলা প্রশাসককে বলব, আপনি যত বড় উপদেষ্টার নাতি হইয়া থাকেন না কেন আপনি নিক্সন চৌধুরীর সঙ্গে চোখ রাঙাইয়া কথা বলবেন না। আমি যদি আমার জনগণ নিয়া আপনার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামি তাইলে কিন্তু আপনি এক মিনিটের জন্যও দম নিবার জায়গা পাবেন না।’ এ সময় উপস্থিত হাজারো মানুষ জেলা প্রশাসকের নাম ধরে নানা অশ্লীল ভাষায় স্লোগান দিতে থাকেন। নিক্সন চৌধুরী বলেন, ‘নৌকার এজেন্টদের সঙ্গে ডিসি যে আচরণ করেছে তার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে এবং আগামী দিনে এই ডিসির বিচার না করা হয় তাইলে নৌকার নেতা-কর্মীরা রাস্তায় শুইয়া বিশ্বরোড অবরোধ করে সবকিছু অচল করে দিব।’ জেলা প্রশাসককে উদ্দেশ করে নিক্সন চৌধুরী বলেন, ‘উনি এক উপদেষ্টার ভয় দেখান, উনি মনে করেন ওই উপদেষ্টাই ওনার ক্ষমতা, আরে! এমন উপদেষ্টা কত দেখলাম মিয়া।’ এ ছাড়া এমপি নিক্সন চৌধুরী ভাঙ্গা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)-কে মোবাইল ফোনে গালমন্দ করেন সেই অডিওটি এখন হাজারো মানুষের মোবাইল ফোনে ঘুরছে। এদিকে জেলা প্রশাসক ১১ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে লেখা এক চিঠিতে সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদের উপনির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার প্রয়োজনে প্রয়োজনীয়সংখ্যক এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করায় নির্বাচনের পূর্বের দিন ও নির্বাচনের দিন বিজয় মিছিল-পরবর্তী জনসভায় বিজয়ী উপজেলা চেয়ারম্যান ও স্থানীয় সংসদ সদস সদস্য কর্তৃক দায়িত্ব পালনরত বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের প্রতি হুমকি এবং মিথ্যা ও মানহানিকর বক্তব্য প্রদান করেছেন।’

ডিসি তার চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, ‘নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের চাহিদার প্রেক্ষিতে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে ১২ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়।’
ডিসি লিখেছেন, ১২ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়ায় স্থানীয় সংসদ সদস্য (ফরিদপুর-৪) মুজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরী ৯ অক্টোবর সকালে তাকে (ডিসি) ফোন করে কৈফিয়ত তলব করেন এবং অধিকসংখ্যক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করায় তার সমর্থিত প্রার্থীর পরাজয় হলে মহাসড়ক অবরোধসহ নানা ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য ডিসি তাকে (সংসদ সদস্য) অনুরোধ করলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে নানা ধরনের অশোভন মন্তব্য করেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সঙ্গেও অনুরূপ আচরণ করেন।

ডিসি চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, ১০ অক্টোবর নির্বাচন সম্পন্ন হয় এবং নিক্সন চৌধুরীর সমর্থিত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী বিজয় লাভ করেন। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী জনসভায় নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘন করে বিজয়ী চেয়ারম্যান প্রার্থী ও সংসদ সদস্য নিক্সন চৌধুরী এবং তার অনুসারীরা নির্বাচনে ১২ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করার বিষয় উল্লেখ করে জেলা প্রশাসনের প্রতি চরম বিষোদগার করেন। দায়িত্ব পালনরত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটসহ জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে অত্যন্ত মানহানিকরভাবে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও হুমকি প্রদর্শন করেন। তার অনুসারীদের দিয়ে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দেওয়ান যা একজন সংসদ সদস্য বা একজন সুস্থ মানসিকতাসম্পন্ন মানুষের পক্ষে অকল্পনীয়। তিনি নির্বাচকালীন দায়িত্ব পালনরত একজন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট (ভাঙ্গা উপজেলা সহকারী কমিশনার) কর্তৃক নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে স্বল্প সময়ের জন্য আটক রাখার কারণে চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে ভদ্রলোকের পক্ষে উচ্চারণ অনুপযোগী অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করেন।

ডিসি তার চিঠিতে আরও উল্লেখ করেন, জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে অত্যন্ত মানহানিকর ও অশোভন উক্তি জেলা পর্যায়ে সরকারের সব উন্নয়ন কর্মকান্ডের সমন্বয়কারী জেলা প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত অবমাননাকর। এ ধরনের হীন বক্তব্য সরকারের সাফল্য সম্পর্কে জনসাধারণের মাঝে ভুল বার্তা দেয় একই সঙ্গে সততা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে প্রশাসনের দায়িত্ব পালনে চরম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এদিকে ডিসির ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে গতকালই নির্বাচন কমিশনকে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় রিটার্নিং অফিসারের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদের উপনির্বাচনে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়। কিন্তু ১২ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিজয়ী উপজেলা চেয়ারম্যান কর্তৃক জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং ইউএনওকে হুমকি দিয়েছেন; যা উপজেলা পরিষদ (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০১৬-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। এ চিঠির অনুলিপি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে দেওয়া হয়েছে।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

এই বিভাগের আরো খবর
মন্তব্য
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: