আমাকেও গালাগাল করেন নিক্সন চৌধুরী

ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন শুধু প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরই নন, আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় নেতা ও মন্ত্রীদেরও অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন। এমন অভিযোগ তুলেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ। তিনি বলেন, স্থানীয় প্রশাসনও এত দিন নিক্সন চৌধুরীর কথায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কোণঠাসা করে রেখেছিল। এখন তারা গালাগাল শুনে নিক্সনের বিরুদ্ধে বলছে। গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এমন অভিযোগ তোলেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন তৈমুর ফারুক তুষার সম্প্রতি চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদের উপনির্বাচনের দিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে মোবাইল ফোনে গালাগাল করেন নিক্সন চৌধুরী। পরে এ ফোনালাপ ভাইরাল হলে দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। ফরিদপুর-৪ আসনে গত দুই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন কাজী জাফর উল্যাহ। দুইবারই ওই আসনে স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন।

কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, ‘ইউএনওকে গালাগালের বিষয়ে কিছু বলার নেই। আমাকেই তো এ রকম অকথ্য ভাষায় অনেক গালাগাল করেছে। এগুলোও ভাইরাল হয়েছে। কিন্তু আমরা তো কোনো ব্যবস্থা নিতে পারিনি। অনেক মন্ত্রীকে নিয়েও অকথ্য ভাষায় কথা বলে।’

কাজী জাফর উল্যাহ আরো বলেন, ‘সে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ভোট করে আবার অনুষ্ঠানের ব্যানারে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ সভাপতির ছবি ব্যবহার করে। এটা তো সে পারে না। কিন্তু তাকে থামাবে কে? সম্প্রতি সে ব্যানার, পোস্টার ছাপিয়েছে, তাকে যুবলীগের এক নম্বর প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এখন দেশজুড়ে যুবলীগের কমিটি গঠনের কাজে সে তৎপর হবে।’

নিক্সন চৌধুরীর যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হওয়ার প্রচারের বিষয়টি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে জানতে চেয়েছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, ‘আমি বিষয়টি জানতে চাইনি। কারণ এ রকম অনেক প্রচারই সে করে। সব তো আর আমলে নেওয়া যায় না। এ রকম কিছু হলে তো আমি দলীয়ভাবেই জানতে পারব। তবে এলাকার সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়। তারা মনে করে, নিক্সন চৌধুরীর অনেক ক্ষমতা।’

স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা প্রসঙ্গে কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, ‘এলাকার মানুষের অভিযোগ হলো, ডিসি, এসপি, ইউএনওসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা সবাই নিক্সন চৌধুরীর কথায় চলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও আওয়ামী লীগের নেতাদের মতের কোনো দাম দেওয়া হয় না। সরকারি কোনো অনুষ্ঠান হলে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা, ছাত্রলীগ, যুবলীগ দাওয়াত পায় না। স্বতন্ত্র এমপি নিক্সন যাকে যাকে দাওয়াত দিতে বলে প্রশাসন তাকেই দাওয়াত দেয়।’

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, নিত্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হওয়া, এ দেশের অর্থনীতিতে করোনার বিরূপ প্রভাব নিয়েও কথা বলেন কাজী জাফর উল্যাহ।

আওয়ামী লীগের জেলা ও মহানগর কমিটিতে বিতর্কিতরা স্থান পেয়েছেন। এগুলো যাচাই-বাছাই করে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটি। এটি সত্যিই করা হবে কি না? যাচাই-বাছাইয়ের কাজ কোন পর্যায়ে আছে? এমন প্রশ্নের জবাবে জাফর উল্যাহ বলেন, “তোমার বক্তব্যটা সঠিক। এ রকম অনেক অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা, ইউনিয়ন পর্যায় থেকেও অভিযোগ এসেছে। অনেক প্রবীণ নেতা অভিযোগ করেছেন, যেহেতু তাঁরা এমপি বা মন্ত্রীর পছন্দের লোক নন সে জন্য তাঁদের কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অনেকে বলেছেন, ‘আমি ৪০ বছর আওয়ামী লীগ করেছি, কিন্তু এমপি মন্ত্রীরা তাঁদের কমিটিতে রাখেন নাই।’ করোনা মহামারির মধ্যেও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে তিনি স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন, ‘এভাবে চলবে না। পুরনো নেতাদের কমিটিতে রাখতে হবে। যাঁরা এমপি মন্ত্রী হয়েছেন, সেটা তাঁদের ভাগ্য। কিন্তু আমার দলের অন্য নেতারাও গুরুত্বপূর্ণ। সবাইকে নিয়ে কমিটি করতে হবে।’”

তিনি বলেন, ‘আমি খুলনা বিভাগের সাংগঠনিক দায়িত্ব পেয়েছি। বিতর্কিতদের বাদ দিতে আমরা খুলনা বিভাগের জেলাগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসব। তাঁদের কথা শুনব। এরপর প্রস্তাবিত কমিটিগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। পুরনো নেতাদের রেখেই যেন কমিটি হয়, সেটা নিশ্চিত করব।’

নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির হওয়া প্রসঙ্গে জাফর উল্যাহ বলেন, ‘যেসব দেশে মুক্তবাজার অর্থনীতি, সেখানে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ইউরোপ, আমেরিকা, ভারতে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, কিন্তু চীনে আবার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কারণ হলো, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ব্যবসায়ীরা ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা অনুসারে দাম হাঁকাতে চান।’

তিনি বলেন, ‘আলু, পেঁয়াজের মতো সমস্যাগুলোয় আমাদের সমর্থকরা হতাশ হন। এগুলো কিন্তু অভিজ্ঞ ও ভালো ব্যবস্থাপনা জানেন এমন মানুষদের দায়িত্ব দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বাজার যদি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তাহলে দামও নিয়ন্ত্রণ থাকবে।’

করোনার ফলে এ দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব প্রসঙ্গে জাফর উল্যাহ বলেন, ‘আমাদের দুটি সেক্টর থেকে মূল বিদেশি মুদ্রা আসে। একটি তৈরি পোশাক শিল্প, আরেকটি রেমিট্যান্স। দুটিতেই আমাদের বড় ধাক্কা লাগার আশঙ্কা রয়েছে। করোনার ফলে ইউরোপ, আমেরিকার বাজারে পোশাকের চাহিদা কমে গেছে। মানুষ এখন টিকে থাকার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে পোশাকশিল্পের আয় কমে যাবে। প্রবাসীদের অনেকে চাকরি হারিয়েছে, অনেকে দেশে ফিরে এসেছে। এর ওপর যদি করোনার দ্বিতীয় ধাপের সংক্রমণ শুরু হয় তাহলে সমস্যা বাড়বে। এতে আমাদের রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমার আশঙ্কা রয়েছে।’

সূত্র : কালেরকণ্ঠ।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

এই বিভাগের আরো খবর
মন্তব্য
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: